বাংলা দ্বিতীয় পত্র সাবজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে ভাবসম্প্রসারণ (Bhab Somprosharon)। স্কুল, কলেজ কিংবা যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সহ সব খানেই এটি (ভাবসম্পসারণ) কমন থাকে।
আমাদের মধ্যে অনেকেই ভাব সম্প্রসারণ মুখস্থ করার চেষ্টা করে থাকেন, যা একদমই একটি ভূল পদ্ধতি। ভাবসম্প্রসারণ হচ্ছে মূলত মনের গভীর কোনো ভাবকে সহজ ও সরল ভাষায় রূপান্তর করা।
আজকের আর্টিকেলে আমরা বাংলা ২য় পত্র ভাব সম্প্রসারণ লেখার নিয়ম, এটি আসলে কি এবং পরীক্ষায় কীভাবে লিখলে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায় – এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ভাব সম্প্রসারণ নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর (FAQ)
গুগল সহ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন (যেমন: Bing) এ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই ভাব সম্প্রসারণ নিয়ে সচরাচর বেশ কিছু সাধারণ প্রশ্ন করে থাকে। নিচে এই প্রশ্নগুলোর সহজ ও একাডেমিক উত্তর দেওয়া হলো:
১. ভাব সম্প্রসারণের অর্থ কি?
‘ভাব’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে অন্তরের গভীর অনুভূতি, চিন্তা বা কোনো মূল্যবান বাণী। আর শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘সম্প্রসারণ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বাড়িয়ে বলা, প্রসারিত করা বা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনো গভীর ভাব বা দর্শনের অন্তর্নিহিত অর্থকে যুক্তি ও উদাহরণের সাহায্যে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে লেখাই সহজ ভাষায় ভাব সম্প্রসারণের মূল অর্থ।
২. ভাবসম্প্রসারণ মানে কী? (What is Bhab Somprosharon)
সাধারণত কবি, সাহিত্যিক কিংবা মনীষীদের কোনো বিখ্যাত উক্তি, কবিতার লাইন বা প্রবাদের মধ্যে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে। যা আপাতদৃষ্টিতে বাক্যটি ছোট মনে হলেও এর ভেতরের মূল অর্থটি থাকে বিশাল। সেই সংক্ষিপ্ত ও সংকুচিত ভাবটিকে নিজের ভাষায় যুক্তি, বাস্তব উদাহরণ, এবং উপমার সাহায্যে বিশ্লেষণ করে সহজভাবে বুঝিয়ে লেখাকেই মূলত ভাবসম্প্রসারণ বলে।
৩. ভাব সম্প্রসারণের অংশ কয়টি ও কি কি?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে ভাব সম্প্রসারণের কয়টি অংশ থাকে ও কি কি? সাধারণত, একটি আদর্শ একাডেমিক ভাব সম্প্রসারণের অংশ সাধারণত ৩টি। অংশগুলো নিচে দেওয়া হলো:
মূলভাব: ভাবসম্প্রারণের মূলভাব অংশে মূলত প্রদত্ত উক্তি বা কবিতার লাইনের ভেতরের আসল কথাটি মাত্র ২-৩ লাইনের মধ্যে সংক্ষেপে লিখতে হয়।
সম্প্রসারিত ভাব: ভাবসম্প্রসারণের এটিই হচ্ছে মূল অংশ। এখানে মূল কথাটিকে অর্থাৎ, যে বিষয়ে ভাবসম্প্রসারণ লিখতে হবে সে বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি, ইতিহাস বা বাস্তব জীবনের উদহরণের মাধ্যমে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে হয়।
মন্তব্য বা উপসংহার: এই অংশটি হচ্ছে ভাবসম্প্রসারণের শেষ অংশ। এখানে পুরো আলোচনার ওপর ভিত্তি করে শেষ ২-৩ লাইনে একটি ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দিয়ে লেখা শেষ করতে হয়।
আশাকরি বিষয়টি বুঝুতে পেরেছেন।
৪. বাংলা ২য় পত্র ভাব সম্প্রসারণ লেখার নিয়মগুলো কি কি?
বাংলা দ্বিতীয় পত্র ভাবসম্প্রসারণ লেখার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে যা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই উপরে একটু আলোচনা করা হয়েছে। একটি বিষয় মনে রাখবেন, ভাব সম্প্রসারণ লেখার জন্য মুখস্থ করার চেয়ে বোঝার দক্ষতা বেশি প্রয়োজন। ভাবসম্প্রসারণ লেখার সঠিক নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ভাবসম্প্রসারণের প্রথমে প্রদত্ত লাইনটি অন্তত দুই থেকে তিনবার খুব ভালো করে পড়তে হবে।
- এরপর আক্ষরিক অর্থ না খুঁজে এর পেছনের রূপক বা অন্তর্নিহিত অর্থটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
- এবং লেখার ভাষা হতে হবে প্রাঞ্জল ও সহজ-সরল। মনে রাখবেন, ভাবসম্প্রসারণে জটিল শব্দ বা সাধু-চলিত ভাষার মিশ্রণ (গুরুচণ্ডালী দোষ) বর্জন করতে হবে।
- নিজের বক্তব্যকে স্পষ্ট করার জন্য বাস্তব জীবন বা সমাজ থেকে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
- সবশেষ, ভাব সম্প্রসারণে কখনো ‘আমি মনে করি’ বা ‘আমার মতে’ এ ধরনের ব্যক্তিগত মন্তব্য (উত্তম পুরুষ) ব্যবহার করা যাবে না।
আশকরি ভাবসম্পসারণ লেখার নিয়ম গুলো বুঝতে পেরেছেন।
৫. ভাবসম্প্রসারণ কত পৃষ্ঠা লিখতে হয়?
অনেকেই বুঝতে পারেন না বা জানে না যে ভাব সম্প্রসারণ কত পৃষ্ঠা লিখতে হয়, ফলে অনেক দ্বিধাদন্ধ কাজ করে।
সাধরণত, ভাবসম্প্রসারণ কত পৃষ্ঠা লিখতে হবে তা মূলত নির্ভর করে পরীক্ষার নম্বর বিভাজনের ওপর। তবে একাডেমিক পরীক্ষার (যেমন: JSC, SSC, HSC) ক্ষেত্রে সাধারণত ১০ নম্বরের জন্য ১.৫ থেকে ২ পৃষ্ঠা (বা ২০০ থেকে ২৫০ শব্দ) লেখা আদর্শ।
সতর্কতা: অতিরিক্ত পৃষ্ঠা ভরার জন্য একই কথা বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লিখলে লেখার মান নষ্ট হয় এবং নম্বর কমে যেতে পারে।
একটি আদর্শ ভাব সম্প্রসারণের সম্পূর্ণ উদাহরণ
উপরে ভাবসম্প্রসারণ লেখার নিয়ম-কানুন জানা হলো। এবার একটি আদর্শ ভাবসম্প্রসারণের সম্পূর্ণ উদাহরণ বা নমুনা দেখে নেওয়া যাক।
পরীক্ষায় ভাবসম্প্রসারণে ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য ভাব সম্প্রসারণকে ৩টি প্যারায় বা অনুচ্ছেদে লিখতে হয়। নিচে পরীক্ষায় লেখার উপযোগী একটি সম্পূর্ণ ভাবসম্প্রসারণের নমুনা বা উদাহরণ দেওয়া হলো:
ভাবসম্প্রসারণ (প্রশ্ন): কীর্তিমানের মৃত্যু নাই।
মূলভাব:
মানুষ মরণশীল প্রাণী। পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে জগত সংসারে যারা মানবকল্যাণে মহৎ ও গৌরবময় কীর্তি বা অবদান রেখে যান সেইসব মানুষেরাই কেবল অমর হয়ে থাকেন। পৃথিবী থেকে চলে গেলেও কর্মের মাধ্যমে তারা মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন।
সম্প্রসারিত ভাব:
পৃথিবীতে মানুষের আয়ু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কেবল দীর্ঘ পরমায়ু লাভ করলেই মানুষের জীবন সার্থক হয়ে উঠে না। মানুষ যদি সমাজ বা দেশের জন্য কোনো কল্যাণকর কাজ না করে তাহলে দীর্ঘকাল বেঁচে থেকেও কোনো কাজে আসে না, তার সেই বেঁচে থাকা অর্থহীন। পক্ষান্তরে, অল্প দিনের জীবনেও যদি কোনো ব্যাক্তি নিঃস্বার্থভাবে মানবসেবা এবং সৃষ্টির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন, তবে তিনি মানবসমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন।
জগতে যারা মহৎ হয়েছেন, তারা নিজের স্বার্থের চেয়ে পরের কল্যাণকে বেশি প্রাধান্য দেন। যেসব ব্যাক্তি বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি বা সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছেন, তাদের শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও তাদের আদর্শ ও কর্ম মানুষকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করে এবং তারা অমর হয়ে থাকেন। মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীগণ তাদের মহান কীর্তির কারণেই আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। মানুষ তাদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে থাকেন। মূলত, মানুষের আসল পরিচয় তার বংশ বা বয়সে নয়, বরং তার কর্মের মধ্যে। মহৎ কর্মই মানুষকে নশ্বর পৃথিবীর বুকে অবিনশ্বরতা দান করে।
মন্তব্য:
পার্থিব শরীর নিয়ে মানুষ চিরকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না, কিন্তু মহৎ কর্মের মাধ্যমে মানুষ মৃত্যুকে জয় করতে পারেন। তাই অলসভাবে জীবন পার না করে মানবকল্যাণে লিপ্ত হওয়াই উচিত, কারণ কীর্তিমান মানুষের কোনো মৃত্যু নেই; তারা চিরকাল অমর।
আরও পড়ুন:
- আয়তনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
- বাংলাদেশের মোট জেলা কতটি আছে ও কি কি?
- জাতি-বর্ণ প্রথা কাকে বলে?
শেষ কথা
এই আর্টিকেলে উপরে আমরা বাংলা ২য় পত্র ভাব সম্প্রসারণ লেখার নিয়ম এবং এর সঠিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছি। ভাবসম্প্রসারণ মূলত মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি হচ্ছে অনুধাবন ও নিজের ভাষায় ফুটিয়ে তোলার বিষয়। আপনি যদি নিয়মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভাব সম্প্রসারণ পড়ার অভ্যাস করেন তাহলে ভবসম্প্রসারণ লেখার দক্ষতা ও শব্দভাণ্ডার দুটোই বৃদ্ধি পাবে। আশা করি, এই আর্টিকেলে উল্লিখিত নিয়মগুলো অনুসরণ করলে পরীক্ষায় আপনারা খুব সহজেই একটি চমৎকার ভাব সম্প্রসারণ লিখে ফুল মার্কস তুলে নিতে পারবেন।



