পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর কিছু নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকির পড়া সুন্নত এবং এটি অনেক ফজিলতপূর্ণ আমল। নামাজ/সালাত শেষে আমল করা দোয়া ও যিকির গুলো একজন বান্দাকে আরও বেশী করে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। তাছাড়া এই দোয়া যিকির গুলো গুণাহ মাফের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি বান্দার অন্তরেও প্রশান্তি বয়ে আনে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ নিয়মিতভাবে নামাজ শেষে বিভিন্ন তাসবিহ, তাহমিদ, তাকবির ও দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিয়েছেন।
সেজন্য এই আর্টিকেলে রাসূল (সা.) ছালাতে সালাম ফিরানোর পর যে সমস্ত যিকির করতেন, সেগুলো নিচে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় তিনি স্বরবে পড়তেন, উচ্চস্বরে নয়। (তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৯৫৯-এর টীকা, দ্রঃ ১/৩০৩)
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর যিকির ও আমল
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা সালাতের পর যেসব যিকির ও আমল করবেন:
১.
আরবি: الله اكبر
উচ্চারণ: আল্ল-হু আকবার (১ বার)
অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে বড়। (ছহীদ বুখারী হা/৮৪২, ১/১১৬ পৃঃ; মিশকাত হা/৯৫৯)
২.
আরবি: أَسْتَغْفِرُ اللهَ ، أَسْتَغْفِرُ اللهَ ، أَسْتَغْفِرُ اللهَ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ (৩বার)
অর্থ: আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। (ছহীহ মুসলিম হা/৫৯১, ১/২১৮ মিশকাত হা/৯৬১)
৩.
আরবি: اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ، تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা আংতাস্ সালা-মু ওয়া মিংকাস্ সালা-মু, তাবা-রক্তা ইয়া যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ। আপনিই শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি আসে। বরকতময় আপনি হে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী’। (ছহীদ মুসলিম হা/৫৯২; মিশকাত হা/৯৬০)
৪.
আরবি: لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِ مِنْكَ الجَدَّ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। আল্লাহুম্মা লা মানিআ লিমা আ’তাইতা, ওয়ালা মু’তিয়া লিমা মানা’তা, ওয়ালা ইয়ানফাউ যাল-জাদ্দি মিনকাল জাদ্দ।
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ! আপনি যা দান করেছেন তা রোধ করার কেউ নেই, আর আপনি যা রোধ করেছেন তা দান করার কেউ নেই। আর কোনো সম্পদশালীর সম্পদ আপনার সকাশে কোনো উপকারে আসবে না (অর্থাৎ আপনার পাকড়াও হতে বাঁচাতে পারবে না)।” (সহিহ বুখারি: ৮৪৪, সহিহ মুসলিম: ৫৯৩)
৫.
আরবি: اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আইন্নি আলা জিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা।
অর্থ: ’হে আল্লাহ! আপনাকে স্মরণ করা, আপনার শুকরিয়া আদায় করা এবং আপনার সুন্দর ইবাদত করার জন্য আমাকে সাহায্য করুন’। (ছহীহ আবুদাউদ হা/১৫২২, ১/২১৩ পৃঃ সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৯৪৯)
৬.
আরবি: اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিস্ সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্ব। মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইযনিহ। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল আলিয়্যুল আযিম।
অর্থ: ’আল্লাহ তিনি, ব্যতীত (প্রকৃত) কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক। কোনরূপ তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন। তাঁর হুকুম ব্যতীত এমন কে আছে যে তাঁর নিকটে সুপারিশ করতে পারে? তাদের সম্মুখে ও পিছনে যা কিছু আছে সবকিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসমুদ্র হতে তারা কিছুই আয়ত্ব করতে পারে না, কেবল যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসী সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে মোটেই শ্রান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ ও সর্বাপেক্ষা মহান’। (বাক্বারাহ ২৫৫)
রাসুল (সা.) বলেন, ফরয ছালাত মেষে ‘আয়তুল কুরসী’ পাঠকারী ব্যক্তির জন্য জান্নাতে প্রবেশ করার কোন বাধা থাকে না মৃত্যু ব্যতীত’। (নাসাঈ, আল-কুবরা হা/৯৯২৮, ৬/৩০ পৃ: বুলুগুল মারাম হা/৩২২, সনদ ছহীহ; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৯৭২ আলোচনা দ্রঃ)
শয়নকালে ’আয়তুল কুরসী’ পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত তার হেফাযতের জন্য একজন ফেরেশতা পাহারায় নিযুক্ত থাকেন, যাতে শয়তান তার নিকটবর্তী হতে না পারে’। (ছহীহ বুখারী হা/২৩১১, ১/৩১০ পৃঃ মিশকাত হা/২১২৩)

৭.
(ক)
আরবি: سبْحَانَ اللهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্ল-হ (৩০ বার)
অর্থ: আল্লাহ মহাপবিত্র
(খ)
আরবি: أَلْحَمْدُ لِلَّهِ
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহ (৩৩ বার)
অর্থ: যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য
(গ)
আরবি: الله أكبر
উচ্চারণ: আলু-হু আকবার (৩৩ বার)
অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে বড়
অতঃপর ১ বার বলবে– لا إله إلا الله وحدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلى كل شَيءٍ قدير
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ছালাতের পর উক্ত তাসবীহ, তাহমীদ, তাকবীর ও দু’আ পাঠ করবে, তার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা সমতুল্য হয়। (ছহীহ মুসলিম হা/৫৯৭; মিশকাত হা/৯৬৭)
অথবা, আরো একবার বলবে ‘আল্ল-হু আবআর’ (৩৪ বার) (ছহীহ মুসলিম হা/৫৯৭; মিশকাত হা/৯৬৭)
৮.
আরবি: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّى أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির-লী মা ক্বাদ্দামতু ওয়ামা আখ্খারতু, ওয়ামা আসরারতু ওয়ামা আ’লানতু, ওয়ামা আনতা আ’লামু বিহি মিন্নী; আনতাল মুক্বাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখ্খিরু, লা ইলাহা ইল্লা আন্তা।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ। আমি যে সমস্ত পাপ পূর্বে করেছি এবং যা পরে করেছি আপনি সব ক্ষমা করে দিন। মাফ করে দিন সেই পাপসমূহ, যা আমি গোপনে করেছি এবং যা প্রকাশ্যে করেছি। মাফ করুন আমার অবাধ্যজনিত পাপ সমূহ এবং সেই সব পাপ, যে পাপ সম্বন্ধে আপনি আমার অপেক্ষা অধিক জানেন। আপনিই আদি, আপনিই অন্ত। আপনি ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই। (ছহীহ আবুদাউদ হা/১৫০৯)
৯.
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَأَعُوذُبِكَ مِنَ الْبُخْلِ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ أَرْذَلِ الْعُمْرِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا وَعَذَابِ الْقَبْرِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আ’ঊযুবিকা মিনাল জুবনি, ওয়া আ’ঊযুবিকা মিনাল বুখলি, ওয়া আ’ঊযুবিকা মিন আরযালিল উমুরি, ওয়া আ’ঊযুবিকা মিন ফিতনাতিদ্দুনইয়া ওয়া আযাবিল ক্বাবরি।
অর্থ: হে আল্লাহ। আমি আপনার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা, কৃপণতা এবং অতি বার্ধক্যে পৌছা হতে। আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুনিয়ার ফিৎনা হতে এবং কবরের শাস্তি হতে’। (ছহীহ বুখারী হা/২৮২২; মিশকাত হা/৯৬৪)
১০.
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল কুফরি ওয়াল ফাক্বরি ওয়া আযাবিল ক্বাবর।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরী, পরমুখাপেক্ষ ও কবরের শান্তি হতে পরিত্রাণ প্রার্থনা করছি। (ছহীদ নাসাঈ হা/১৩৪৭; মিশকাত হা/২৪৮০)
১১.
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ইলমান না-ফিআঁও, ওয়া রিযক্বন তয়্যিবাঁও, ওয়া আমালান মুতাক্বাব্বালা।
অর্থ: ’হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী জ্ঞান চাচ্ছি, পবিত্র রূযী এবং গ্রহণীয় আমল প্রার্থনা করছি’। রাসূল (সা.) বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর এই দু’আ পড়তেন’। (ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/৯২৫, পৃঃ ৬৬; সনদ ছহীহ, মিশকাত হা/২৪৯৮)
১২.
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক ছালাত শেষে সূরা ‘ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস’ পড়ার নির্দেশ দিতেন (১ বার করে) (ছহীহ আবুদাউদ হা/১৫২৩, পৃঃ২১৩; সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৯৬৯)
তবে বাদ ফজর এবং বাদ মাগরিব ৩ বার করে পড়বে। (তিরমিযি হা/৩৫৭৫ মিশকাত হা/২১৬৩, সনদ ছহীহ)
আরও পড়ুন:
- সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দু’আ ও ফজিলত
- রোজাদারের জন্য বিশেষ ৯টি আমল: আল্লাহ খুশি হন যে কাজে!
- ভুল ধারণার অবসান! এই ৯টি কাজ করলেও আপনার রোজা ভাঙবে না
পরিশেষে বলা যায় যে, ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে জায়নামাজ ত্যাগ না করে অন্তত কয়েকটা মিনিট সময় নিয়ে উপরে আলোচিত আমলগুলো করা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি। তাছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাজের পর যিকির ও দোয়া করা শুধু একটি প্রথা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুন্নাহ মোতাবেক নিয়মিত এসকল যিকির ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।



