সোনার তরী কবিতার মূলভাব ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

আর্টিকেল সূচি

বাংলার সাহিত্যাকাশে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নাম হচ্ছে ‘সোনার তরী’ কবিতাটি।

আর আজ এই আর্টিকেলটিতে ’সোনার তরী‘ কাব্যগ্রন্থের এই ‘সোনার তরী’ কবিতাটির মূলভাব ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

সোনার তরী কবিতাটি রচনার প্রেক্ষাপট

 

কবীগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর ভার পড়েছিল তাদের জমিদারি তদারকি করার। সেই সুবাদেই তিনি তার ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটি রচনাকালীন পর্বে পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এবং কাজের তাগিদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিভিন্ন যায়গায় বাস করতে হয়েছিল। যেমন: শাহজাদপুর, শিলােইদহ, পতিসর, কালিগ্রাম প্রভৃতি স্থান। যার ফলে বাংলার নগ্ন পল্লি প্রকৃতি সমস্ত বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য সারা প্রাণ দিয়ে অনুভব করবার সুযোগ তাঁর মিলে এবং সেই সাথে পল্লির নরনারীর ঘরকন্নার খুঁটিনাটি, তাদের ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান, আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিবিড় পরিচয় হয়।

তাঁর এই নিবিড় পরিচয়ের তন্ময়তার প্রকৃতির সাথে কবি একাত্মতা অনুভব করলেন। মনে হলো, তিনি সৃষ্টির আদিম যুগ হতে মাটির সাথে মিশে আছেন। এবং নিজের জীবন ধারার মধ্যে তিনি অনুভব করেছেন বিশ্বপ্রকৃতির বিচিত্র রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ ও গন্ধ।

কবিগুরুর কাছে তরুলতা, আকাশ, বালুচর, মাঠ, নদী, সন্ধ্যাতারাকে তাঁর কতদিনের পরমাত্মীয় বলে মনে হলো। এবং সেগুলো তাঁর অন্তরঙ্গ জীবনের পক্ষে গভীর তাৎপর্য হয়ে উঠল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-গান তাঁর অন্তর্গূঢ় রহস্যকে আত্মহারা করে দিল।

এ সময়কার কবি অপরিসীম প্রকৃতি ‘সোনারতরী’ প্রথম কবিতা রচনায় দশ মাস পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমথ চৌধুরীকে যে প্রত্রটি (২১ মে, ১৮৯০) লেখেন, তার মধ্যে কবি প্রসঙ্গক্রমে তাঁর কবি মানসের একটি বিশেষ প্রবণতা সম্বন্ধে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছেন।

 

সোনার তরী কবিতায় কবি মানস

 

বাংলা সাহিত্যে ‘সোনার তরী’র নাম ভূমিকায় ‘সোনার তরী’ নিয়ে যত হট্টগোল হয়েছে এতো হট্টগোল আর কোনো কবিতা নিয়ে হয়নি। এই ‘সোনার তরী’ কবিতা নিয়ে বহু পণ্ডিত ও সমালোচক ববহু প্রকারে অর্থ আবিষ্কার করেছেন।

’সোনার তরী’ কবিতায় যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা যদি পরিপূর্ণ করা পদ্মাতীরে, একগর্জনমুখর বর্ষা প্রভাতে বন্যাপ্লাবিত ক্ষেত্রে শিলাইদহের কোনো কৃষকের ধান কাটা ও পারগামী কোনো নৌকায় সেই ধান উঠাবার অসামর্থ্যে চিত্র হয়, তবে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ”কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয় যে পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী। এই যে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জ নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতি রাত্রে শত সহস্র নক্ষত্রের অভ্যুদয় হচ্ছে, জগৎসংসারের এ যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়।”

[ছিন্নপত্র, ৩১-৩২ পৃ.]

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় গভীর মনোযোগ ও আনন্দের সাথে তাঁর চারদিকের নরনারীর গতিবিধি লক্ষ করেছেন, অতি ক্ষুদ্র একটি শিশু বা নরী এমন কি গো-মহিষ পর্যন্ত তাঁর চোখ এড়ায়নি।

 

সোনার তরী কবিতার মূলভাব

 

সোনার তরী কবিতাটির মূলভাব লেখার জন্য কবির ব্যাখ্যার বিভিন্ন অংশগুলো মিলিয়ে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

”ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়ায়ে ভরি।”

এই সংসারের প্রত্যেক মানুষই  কৃষক। তার ক্ষেত্রটি আয়ুর দ্বারা সীমাবদ্ধ জীবন। পদ্মার স্রোতের মতো ক্ষুরধার ছুটে চলেছে অনন্ত কালস্রোত। সে ক্ষেতে বসে তার কর্মরূপ সোনার ধান কেটে স্তূপীকৃত করছে। এমন সময় কালের দূত মৃত্যু বন্যার ন্যায় তার আয়ুর চারি আলি-ঘেরা জীবনকে গ্রাস করতে আসল। তার পশ্চাতেই মহাকাল নাবিকের বেশে ইতিহাসরূপ সোনার তরী নিয়ে সোনার ধানরূপ জীবনের কার্যকে তার নৌকায় তুলে নিলেন। কিন্তু অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি মানুষকে নিলেন না।

কাল ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যুগে যুগে মানুষের সমস্ত কর্ম সঞ্চিত করে রেখেছে-

”এতকাল নদীকূলে

যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

সকলি দিলাম তুলে

থরে বিথরে

এখন আমারে লহো করুণা করে।”

মানুষ চায় তার কর্ম, তার ধ্যান-ধারণার ফল, তার জ্ঞান বিজ্ঞানের উপকার যেমন জগৎ ভোগ করছে, সেই সঙ্গে তার ব্যক্তি জীবনকেও যেন লোকে স্মরণ করে। কিন্তু জগৎ ব্যক্তিকে চায় না, কর্মকেই চয়। মানবজীবনের এই একটি বড় ট্র্যাজেডি-

”শ্রাবণগগন ঘিরে

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে

শূন্য নদীর তীরে

রহিনু পড়ি

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।”

আমরা অন্যভাবে এই কবিতাটিকে বুঝতে পারি। কবির ভাব ও রস-জীবনের ক্রমবিকাশের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সোনার তরী লেখার সময় তাঁর মনে একটি আন্দোলন চলছিল, সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে কবি যেন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মানসীতে কবি সংকীর্ণ, ভোগ-ক্লেদবর্জিত আদর্শ সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তারপর ’রাজারানি’, ’বিসর্জন’, চিত্রাঙ্গদা’ প্রভৃতি অব্যবহিত পরবর্তী কালের নাট্যকাব্যে ও ঐ একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। বিশ্বের পরিপূর্ণ ও চিরন্তন সৌন্দর্য কালপ্রবাহে ভেসে চলেছে। মানুষ তাঁর জীবনের গণ্ডীতে আবদ্ধ থেকে ক্ষণিক ভোগের উপাদান সঞ্চয় করছে। বিশ্ব সৌন্দর্য জীবনের মধ্য দিয়ে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নিরন্তন প্রবাহিত হয়ে চলেছে, কিন্তু মানুষ এর দিকে লক্ষ না করে ভোগবহুল, ক্ষণিক, খণ্ড সৌন্দর্যের কুহকে ভুলে রয়েছে। কিন্তু মানুষ এতে কোনো তৃপ্তি বা শান্তি পাচ্ছে না। তার ভোগের সঞ্চয়গুলো সে ঐ সৌন্দর্য তরণীতে উঠিয়ে নিয়ে এবং এর সাথে যুক্ত করে, তার ভোগের আয়োজনে সে অতি ব্যাপক ও সমারোহ সম্পন্ন করতে চায়।

কিন্তু সে এবং তার সঞ্চয়- ভোক্তা ও খণ্ড সৌন্দর্যের অংশগুলো কখনো একত্রে গিয়ে চিন্তন বিশ্ব সৌন্দর্যের সাথে মিলিত হতে পারে না। সৌন্দর্য তরণী তার ভোগের খণ্ড সৌন্দর্যগুলো নিয়ে গেল। কারণ তারা অখণ্ড ও পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের অংশ, কিন্তু তাকে নির না। কারণ তারই ভোগলোলুপ চক্ষে ও আত্মসর্বস্ব অনুভূতিতে এই সৌন্দর্যের অখণ্ড ও চিরন্তন রূপটি ঢাকা পড়ে যায়। সে অনন্তের ধনকে তার নিজের ভোগের কারাগারে বন্দি করে রাখতে চায়। তাই যে আদর্শ ও পূর্ণ সৌন্দর্যলাভ বঞ্চিত হলো।

সহজ ভাষায় বললে, সৃষ্টির প্রবহমান নদীতে এই সৌন্দর্য তরণী চিরকাল ভেসে চলেছে। জীবনের ক্ষদ্র বৃহৎ শত শত অভিব্যক্তির ঘাটে ঘাটে এই তরুণী অনুক্ষণ ভিড়তে ভিড়তে চলেছে। আত্মসর্বস্ব ভোগ ত্যাগ করলে, পূর্ণ সৌন্দর্যকে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ড না করলে এবং অখণ্ড সৌন্দর্যের উপাসক হলে, সোনার তরীতে স্থানলাভ হতে পারে।

 

আরও পড়ুন:

 

সোনার তরী কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

 

নিচে সোনার তরী কবিতাটির জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর গুলো দেওয়া হলো:

 

’সোনার তরী’ কাব্যটি কত সালে প্রকাশিত হয়? বা ‘সোনার তরী’কাব্যের প্রকাশকাল কত?

উত্তর: ‘সোনার তরী’ কাব্যের প্রকাশকাল হচ্ছে ১৮৯৪ সাল।

 

’সোনার তরী’ কাব্যটি কবি কাকে উৎসর্গ করেছেন?

উত্তর: ‘সোনার তরী’ কাব্যটি কবি তার ভ্রতা শ্রীদেবেন্দ্রনাথ সেনকে উৎসর্গ করেছেন।

 

’সোনার তরী’ কবিতাটি কোন আঙ্গিকে রচিত?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতাটি রূপকের আঙ্গিকে রচিত।

 

’সোনার তরী’ কবিতায় ধান কিসের প্রতীক?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতায় ধান হচ্ছে সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতীক।

 

’সোনার তরী’ কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।

 

’সোনার তরী’ কবিতায় নদী কিসের প্রতীক?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতায় নদী হচ্ছে কাল-প্রবাহের প্রতীক।

 

’সোনার তরী’ কবিতায় ‘তরী’ কিসের প্রতীক?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতায় ‘তরী’ হচ্ছে অখণ্ড ও আদর্শের প্রতীক।

 

’সোনার তরী’ কবিতায় মাঝি কিসের প্রতীক?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতায় মাঝি সৌন্দর্যের প্রতীক।

 

’দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।’ কবি কাকে চেনার কথা বলেছেন?

উত্তর: নৌকার মাঝিকে।

 

’সোনার তরী’ কবিতাটি কোথায় বসে লেখা?

উত্তর: ’সোনার তরী’ কবিতাটি বোট, শিলাইদহে লেখা।

 

’সোনার তরী’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের সাথে কোন ধরনের মানুষের পরিচয় ঘটে?

উত্তর: ’সোনার তরী’ রবীন্দ্রনাথের সাথে সংসারের সাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় ঘটে।

 

’সোনার তরী’র স্বরূপ কী?

উত্তর: ’সোনার তরী’ স্বরূপ হচ্ছে সোনার তরী আমাদের সকল ফসল তুলে নেয় কিন্তু আমাদেরকে নেয় না।

 

পরিশেষে, এই ‘সোনার তরী কবিতার মূলভাব ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর’ আর্টিকেলটি পড়ে আশাকরি একটু হলেও আপনার উপকারে এসেছে। আপনার আরও কোনো বিষয়ে জানার থাকলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment