প্রতিবেদন কাকে বলে? | প্রতিবেদন লেখার নিয়ম উদাহরণ সহ ২০২৪

এই আর্টিকেলটিতে প্রতিবেদন কাকে বলে, প্রতিবেদন লেখার নিয়ম এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আপনি যদি এ বিষয়ে জানতে আগ্রহী হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়বেন।

 

প্রতিবেদন কী? বা প্রতিবেদন কাকে বলে?

 

ইংরেজি ‘Report’ শব্দটির বাংলা পারিভাষিক শব্দ হচ্ছে ‘প্রতিবেদন’। Report শব্দের আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থ সমাচার, বিবরণী, বিবৃতি হলেও বাংলা ভাষায় ‘প্রতিবেদন’ শব্দটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, কথিত এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘প্রতিবেদন’ শব্দটির পাশাপাশি ‘রিপোর্ট’ শব্দটিও বাংলা ভাষঅয় একইভাবে এবং একই অর্থে প্রচলিত।

কোনো বিশেষ ঘটানা বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যানুসন্ধানের পর সে বিষয় সম্পর্কে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিরণী পেশ করার নামই হচ্ছে প্রতিবেদন।

প্রতিবেদন বিশেষ কৌশলে বা পদ্ধতিতে রচিত বিবৃতি বা বিবরণী। কারো কারো মতে তথ্যগত ও সত্যনিষ্ঠ বিবরণীকেই প্রতিবেদন বলা হয়।

অর্থাৎ, কোনো তথ্য ঘটনা বা বক্তব্য সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দানই প্রতিবেদন।

অধ্যাপক মাইক হ্যাচ বলেন, ‘প্রতিবেদন হলো একটি সুসংগঠিত তথ্যগত বিবৃতি বা কোনো বক্তব্য সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত অথচ সঠিক বর্ণাবিশেষ। একে যথেষ্ট সতর্কতা, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা, গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর তৈরি করা হয়’।

প্রতিবেদন রচয়িতাকে বলা হয় ‘প্রতিবেদক বা Reporter’। প্রতিবেদকের কাজের ফলেই হচ্ছে প্রতিবেদন।

একজন প্রতিবেদকের দায়িত্ব হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য, উপাত্ত, সিদ্ধান্ত, ফলাফল ইত্যাদি খুঁটিনাটি অনুসন্ধানের পর বিবরণী তৈরি করে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোনো কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্যে পেশ করা।

সংবাদপত্রে প্রতিদিন এধরনের অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদপ্রত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন প্রতিবেদক বা রিপোর্টার। সেই রিপোর্টে তার ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি, সুপারিশ, নিজস্ব মতামত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।

পক্ষান্তরে, অন্যান্য প্রতিবেদনে কখনো কখনো প্রতিবেদকের মন্তব্য বা সুপারিশ বা নিজস্ব চিন্তাভাবনা স্থান পায় বলে অনেকেই সংবাদপত্রের প্রতিবেদনকে অন্যান্য প্রতিবেদনের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে বলে মত ব্যক্ত করেন।

কিন্তু এ ধরনের ধারণা সঙ্গত নয়।

কারণ, সংবাদপত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা। সাধারণ-পাঠ সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদন পাঠের পর তার যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য বা সুপারিশ কিংবা সেই একই  প্রতিবেদনের ওপর প্রশাসনিক যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত পুনরায় প্রতিবেদককে তা সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে হয় বা করে থাকেন বলে সেখানে তাঁর মতামত বা সুপারিশের কোনো মূল্য নেই।

কেননা, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনটি হয় সর্বজনীন তথা এ প্রতিবেদন পাঠে যেকোনো পাঠকই তার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে যে কোনো মন্তব্য করতে পারেন কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দাতের নেই, যদি না প্রশাসন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেন।

পক্ষান্তরে প্রসাশনিক, ব্যবসায়িক, আইন-আদালত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হয় সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে উপনীত হন বলে, এসব প্রতিবেদনে প্রতিবেদক সে বিষয় সম্পর্কে কিছু সুপারিশ বা মন্তব্য বা মতামত দিয়ে থাকেন, কর্তৃপক্ষও প্রতিবেদকের প্রদত্ত মতামতকে বিবেচনা করেন।

ভাষাবিদ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাংলায় কী লিখবেন, কেন লিখবেন’ গ্রন্থে বলেছেন যে, ‘সংবাদের উপর মন্তব্য করার জন্য সম্পাদকীয় নিবন্ধকারেরা আছেন, ভাষ্যকারেরা আছেন, তা ছাড়া আছেন নিয়মিত কলামের লেখকেরা ও কাজ প্রতিবেদক বা রিপোর্টারের নয়। প্রতিবেদন বা রিপোর্ট মন্তব্যবর্জিত হবে।’

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন রচনার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো: ভূমিকা অংশেই প্রতিবেদনের উৎস বা সূত্র দেওয়া থাকে। যেমন: নিজস্ব সংবাদদাতা/প্রতিনিধি/প্রতিবেদক, রয়টার জানাচ্ছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি মুখপত্র জানান ইত্যাদি।

পত্রিকায় প্রকাশের জন্যে সংবাদ প্রতিবেদন পাঠালে প্রতিবেদনের সত্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কতখানি তা সংবাদপত্রে বিবেচনা করা হয় বলে প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রতিবেদকের পরিচয়, পদবি, নাম, ঠিকানা, তারিখ, স্বাক্ষর দিতে হবে। আর যদি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয় সেটিও সেখানে উল্লেখ করে দিতে হবে।

[বি:দ্র:] দৈনিক সংবাদপত্রের চিঠিপত্র কলামে জনগণের বিভিন্ন সমস্রা, অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিনিয়ত যে চিঠিপত্র প্রকাশিত হয় তাকে দৈনিক প্রত্রিকায় প্রকাশের জন্যে চিঠি বলা হয়। এসব চিঠি প্রতিবেদনের অন্তর্গত নয়। পত্রিকায় প্রকাশের জন্যে চিঠি কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লেখা নয়, আবার এ জাতীয় পত্রকে ব্যক্তিগত পত্রও বলা যায় না। জনমত প্রকাশ বা গঠনই এ জাতীয় পত্রের উদ্দেশ্য। সে কারণেই এগুলোকে বৈষয়িক চিঠির অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

আশাকরি প্রতিবেদন কী? বা প্রতিবেদন কাকে বলে? এ বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা পেয়ে গেছেন।

 

প্রতিবেন রচনা করার উদ্দেশ্য কী?

 

প্রতিবেদন রচনা করার কতকগুলো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। সংবাদপত্রে প্রতিদিন যে অসংখ্য প্রতিবেদন ছাপানো হয়, তার মধ্যে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় প্রয়োজনে অনেক প্রতিবেদন বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

যেমন: আর্সেনিক দূষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন, ডেঙ্গু জ্বর সংক্রান্ত প্রতিবেদন, পরীক্ষা দুর্নীতি বা চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি সম্পর্কে প্রতিবেদন ইত্যাদি।

এসব প্রতিবেদন পাঠ করার মাধ্যমে আমরা সচেতন ও সতর্ক হতে পারি। তাছাড়া সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন সমিতি, সংস্থা, সংগঠন নানা ধরনের প্রতিবেদন বা বাৎসরিক রিপোর্ট প্রদান করেন।

বস্তুত প্রতিবেদন বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর হয় বলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুরোর প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। যেমন:

. নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ঘটনা বিষয়বস্তু সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্টভাবে অবহিত,

. নিরপেক্ষভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা,

. কাজের সুষ্ঠু সমন্বয়সাধন করা ও

. কোনো বিশেষ ঘটনা বিষয়কে সরেজমিনে তদন্ত করে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল সংগ্রহ করা এবং এর সত্যতা যাচাই করে ওই ঘটনা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ধারণা দেওয়া।

প্রয়োজনে প্রতিবেদন সম্পর্কে সুপারিশ করা (তবে সুপারিশের বিষয়টি পত্রে প্রকাশের জন্য যে প্রতিবেদন তাতে প্রযোজ্য নয়)।

 

প্রতিবেদনে কয়টি অংশ থাকে ও কি কি?

 

প্রতিবেদনে সাধারণত তিনটি অংশ থাকে। যথা:

. প্রারম্ভিক অংশ,

. প্রথম অংশ ও

. পরিশিষ্ট।

প্রারম্ভিক অংশ: এতে থাকে মূল শিরোনাম, প্রাপকের নাম-ঠিকানা, সূত্র ও বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার নির্দেশক কথা।

প্রধান অংশ: এতে থাকে বিষয় সম্পর্কে ভূমিকা মূল প্রতিবেদন, উপসংহার ও সুপারিশ।

পরিশিষ্ট: এতে থাকে তথ্য নির্দেশ, গ্রন্থ বিবরণী, কমিটির তালিকা ও অনুষঙ্গিক বিষয়াদি।

 

প্রতিবেদনের শ্রেণিবিভাগ ও উপযোগিতা

 

প্রতিবেদনের শ্রেণিবিভাগ: প্রতিবেদনকে নির্দিষ্টভাবে শ্রেণিবিভাগ  করা সম্ভব নয়। কারন, বৈচিত্র্য অনুযায়ী প্রতিবেদনও নানা প্রকার হয়ে থাকে।

সাধারণত প্রতিবেদনেই বলা হয় বা প্রকাশিত হয় যে এটি কোন ধরনের প্রতিবেদন। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনকে নানান ধরনের নামেও বিশেষণে অভিহিত করা হয়।

যেমন: নিয়মিত প্রতিবেদন, সাময়িক বা খসড়া প্রতিবেদন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন, রীতিসিদ্ধ বা রীতিবিরুদ্ধ প্রতিবেদন, বিশেষ প্রতিবেদন, নির্বাহী প্রতিবেদন, প্রর্থিত বা অপ্রার্থিত প্রতিবেদন, কোম্পানি প্রতিবেদন, বাৎসরিক প্রতিবেদন, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদি।

তবে মোটাদাগে প্রতিবেদনকে দুই ভাবে ভাগ করা যায়। যথা:

১. সংবাদ প্রতিবেদন: সংবাদপত্রে প্রকাশিত কোনো ঘটনা সম্পর্কিত প্রতিবেদনকে সংবাদ প্রতিবেদন বলে। নিজস্ব সংবাদদাতা কোনো ঘটনা, স্থান, অবস্থা প্রভৃতি বিষয় যাচাই করে সে সম্পর্কিত তথ্য, তত্ত্ব, উপাত্ত তুলে ধরা হয়। দাপ্তরিক প্রতিবেদন দু ধরনের হয়। যেমন:

(ক) তদপ্ত প্রতিবেদন: এটি কোনো ঘটনা, দুর্ঘটনা, গোলযোগ, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তদন্ত সাপেক্ষে প্রকাশ করা হয়।

(খ) কারিগরি প্রতিবেদন: এটি সাধারণত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা, জনস্বার্থে অবদান, অর্থনৈতিক লাভালাভ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যেমন: ‘পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই’ একটি কারিগরি প্রতিবেদনের উদাহরণ।

প্রতিবেদনের উপযোগিতা: প্রতিবেদনের সীমা-পরিসীমা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় যেমন ব্যাপক তেমনি এর উপযোগিতা ও গুরুত্বও অপরিসীম। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ বা বিবরণের জন্যে প্রতিবেদনের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেদনে কোনো বিশেষ ঘটনা বা বিষয়কে সরেজমিনে তদন্ত করে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল প্রকাশ করা হয় বলে, তা থেকে আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি তথ্য অবগত হওয়া যায়।

কর্তৃপক্ষও সহজে সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন। প্রতিবেদনের মাধ্যমে কোনো বিষয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ, সংগঠন, নির্দেশনা, নিষন্ত্রণ, ফলাফল নিরূপণ, সমন্বয়সাধন ইত্যাদি কাজে সহায়তা পাওয়া যায়।

প্রতিষ্ঠনের সুষ্ঠু পরিচালনা, নীতি নির্ধারণে প্রতিবেদন সহায়ক হয়। কোনো বিরোধপূর্ণ ঘটনার মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রতিবেদন মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব নানা বিষয়ে প্রতিবেদন ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বর্তমান সমাজব্রবস্থায় প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

 

প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্যগুলো কি কি?

 

নিচে প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:

১. প্রতিবেদন নির্দিষ্ট কাঠামো ও নিয়মানুযায়ী রচিত হতে হবে।

২. কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয় অবলম্বনে প্রতিবেদনটি বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর হতে হবে।

. প্রতিবেদনের বক্তব্য হবে সহজ-সরল, নিরপেক্ষ, যুক্তিযুক্ত ও বাহুল্য বর্জিত। প্রতিবেদকের কাছে বিশেষভাবে প্রত্যাশিত যে, তাঁর সংবাদে প্রকৃতপক্ষে েএমন কোনও বিশেষণ ব্যবহার করা যাবে না, যার ফলে তাঁর রচনাকে পক্ষপাতদুষ্ট বা াভিসন্ধিমূলক মনে হয়।

৪. জটিল বিষয়ে সরল ব্যাখ্যা দান করাই সঙ্গত।

. প্রতিবেদনে প্রতিবেদকের কোনো প্রকার আবেগ বা ভাবোচ্ছ্বাস প্রকাশ করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, প্রতিবেদনের ভাষা হবে সরল। কিন্তু সরল ভাষা বলতে তরল ভাষা বোঝায় না। যেমন: আবেগ বলতে বোঝায় না উচ্ছ্বাস। ভাষা সম্পূর্ণ নিরাবেগ হবে, এমন দাবি অনুচিত। কেননা যা নিতান্ত নিরাবেগ, সেই শুকনো ‘কেঠো’ ভাষা একই জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে থাকে, আবেগের ছোঁয়া না লাগা পর্যন্ত তাতে গতির স্পন্দন জাগে না। কিন্তু আবেগ নামক ব্যাপারটাকে যে সংযমের লাগাম পরিয়ে রাখা চাই, সেটা মনে রাখতে হবে। আবেগ সংযত না হয়ে উচ্ছ্বাসিত হলে ভাষাকে তা অনর্থূক আবিল করে মাত্র। রচনার স্বচ্ছতা তাতে নষ্ট হয়। লেখকের যা বক্তব্য তা উচ্ছ্বাসের ফেনার তলায় চাপা পড়ে যায়।

৬. বাক্য জটিল হলে ভাষা দুর্বোধ্য হয়। যে ভাষা দুর্বোধ্য, তা অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নানা পত্রপত্রিকায় নানা বিষয়ে বাইরে থেকে অনেক লেখা পাঠানো হয়। তার দু-একটি ছাপা হয়, অধিকাংশই ফেরত যায়। কোনো লেখা ছাপা হবে আর কোনটা হবে না, তা যারা ঠিক করেন, একটা ব্যাপারে তাঁর প্রায় সকলেই দেখা যায় একমত। সেটা এই যে, যেসব লেখা তাদের হাতে আসে, তার অন্তত কিছু অংশের ‘বিষয়বস্তু খুবই কৌতুহলোদ্দীপক’। বস্তুত সেগুলোছাপার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাদ পড়ে যায় একমাত্র ভাষা কঠিন বলে।

৭. বাক্যের পূর্বাপর সংগতি যেন কোনও মতেই ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে লক্ষ রাখবে হবে। যেমন কোনো বাক্যের প্রথমাংশে ‘যখন’, ‘যত’, ‘যদিও’, ‘যে-কারণে’, ‘যেজন্য’, ‘যেহেতু’ ইত্যাদি শব্দ থাকলে পরবর্তী অংশের সঙ্গে তাদের একটা সুষ্ঠু যোগসম্পর্ক থাকতে হবে। নইলে বক্তব্যের পূর্বাপর সংগতির সূত্র ছিন্ন হবে।

৮. প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুকে কয়েকটি অনুচ্ছেদে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি অনুচ্ছেদে বণিৃত হবে প্রতিবেদনের ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার বিবরণ এবং বস্তুনিষ্ঠ, তথ্রনির্ভর ও অনুসন্ধানমূলক বিবরণী। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যে, প্রতিটি অনুচ্ছেদ শুরু করতে হবে প্রসঙ্গ বাক্য দিয়ে। যেন পাঠক তা দেখেই বুঝতে পারে প্রতিবেদনের কোন দিকটি ওই অনুচ্ছেদে বিশদ হয়েছে।

৯. বাক্যে যতি-চিহ্নের ব্যবহার যথাযথ হতে হবে।

১০. প্রতিবেদনের শিরোনামে উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা সঙ্গত নয়।

১১. সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই অর্থাৎ খবর হিসেবে যা গুরুত্বর্পূ তাই প্রতিবেদনে স্থান পাবে। বক্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের খ্যাতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে বস্তু, ব্যাক্তি, স্থান ও কাল সবই প্রতিবেদককে সতর্কভাবে বিচার করে আসল বা সত্র বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরতে হবে।

১২. সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে অন্যান্য প্রতিবেদনে সমস্যা সম্পর্কে সুপারিশ বা মতামত দেয়া যেতে পারে।

১৩. প্রতিবেদনে ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত’ বলে কোনো বিষয়কে চিহ্নিত করা যাবে না, বরং সুনির্দিষ্ট তথ্য-সূত্র বা উৎস-নির্দেশ করতে হবে। এছাড়া ‘পরিশেষে বলি’, ‘প্রসঙ্গত বলি’ ইত্যাদিও যথাসম্ভব বর্জনীয়। এবংকি ‘বলাবাহুল্য’ ও লেখা উচিত নয়। বলাবাহুল্যই যদি হবে তো বলার প্রয়োজন কেন?

 

প্রতিবেদন রচনা করার নিয়ম

 

প্রতিবেদন রচনার নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিবিভাগ না থাকলেও নবম-দশম শ্রেণিতে প্রতিবেদনকে তিনটি ভাগে ভাগ যায়। যথা:

১. তদন্ত প্রতিবেদন,

২. সংবাদ প্রতিবেদন ও

৩. সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন।

 

তদন্ত প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

 

তদন্ত প্রতিবেদনে লেখকের ব্যক্তিগত মতামত সম্পর্কে লিখতে হয়। তদন্ত প্রতিবেদন লেখার কিছুটা মিল বা সাদৃশ্য রয়েছে সাধারন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়মের সাথে।

তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে হয় দায়িত্ব প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের কাছে।

প্রতিবেদককে প্রতিবেদনের শুরুতে ঘটনা ব্যাখ্যা করার পর ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানাতে হয়।

 

নিচে তদন্ত প্রতিবেদন লেখার সম্পূর্ণ একটি স্ট্রাকচার বা কাঠামো তুলে ধরা হলো:

 

যানযট: প্রয়োজন আশু প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদনক:

ঢাকা: যানযট ঢাকা শহরের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা…(তিন চার লাইনের ভিতর লিখতে হবে)

ঢাকা শহরের যানযট…..(ব্যাখ্যা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কমপক্ষে দশ লাইনের বেশি লিখতে হবে।)

(শেষ অংশ দুই তিন লাইনের ভিতর হবে যেখানে উপরে আলোচিতন পুরো বিষয়টির সারমর্ম থাকবে।)

প্রতিবেদকের নাম ও ঠিকানা: ‘খ’

প্রতিবেদনের

৩/৩ মতিফিল, ঢাকা।

প্রতিবেদনের শিরোনাম: যানযট: প্রয়োজন আশু প্রতিকার

তৈরির সময়: বিকাল ৫:০০ টা।

তৈরির তারিখ: এপ্রিল ০৪, ২০২৩।

 

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

 

সংবাদ প্রতিবেদনে সাধারণত দুইটি অংশ থাকে। যথা: প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশ।

প্রথম অংশ: প্রথম অংশে দুই লাইনের মধ্যে একটি দৃষ্টিনন্দন বা আকর্ষনীয় শিরোনাম দিতে হবে।

দ্বিতীয় অংশ: দ্বিতীয় অংশে শিরোনামের বিস্তারিত আলোচনা বা বর্ণনা লিখতে হবে। সংবাদ প্রতিবেদন লেখার একটি সুবিধা হচ্ছে সংবাদ প্রতিবেদনে শুধু শিরোনাম লেখার পরেই সরাসরি মূল আলোচনায় চলে যাওয়া যায়। সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে সম্পাদকের নিকট আনুষ্ঠানিক পত্র বা খাম আঁকার প্রয়োজন নেই। প্রশ্নের ভিতর সংবাদপত্র বা প্রতিবেদকের নাম থাকলে তা অনুসরণ করতে হবে। যদি তা না থাকে তবে কাল্পনিক কোনো নাম ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কোন দিবস বা কোনো সমস্যার বিবরণ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করে থাকেন। এজন্য প্রধান একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিবেদনটি লেখার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। যে কিনা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম অনুসারে প্রতিবেদনটি লিখে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ: মনে কর যে, তুমি ‘খ’ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। স্বাধিনতা দিবস উপলক্ষে তোমাদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করার অনুমতি চেয়ে প্রতিবেদন রচনা কর।

যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার শুরু করতে হয়:

 

বরারবর,

প্রধান শিক্ষক,

এভাবেই জাতীয় প্রতিবেদন শুরু করতে হয়। তারপর বিষয় অনুযয়ী শিরোনাম লিখে বিষয়বস্তু  সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। পত্র শেষে প্রধান শিক্ষকের কাছে একটা দিতে পারেন তবে না দিলেও কোনো সমস্যা হবে না।

নিচে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন লেখার সম্পূর্ণ স্ট্রাকচার বা কাঠামো তুলে ধরা হলো:

এপ্রিল ০৪, ২০২৩

প্রধান শিক্ষক,

‘ক’ স্কুল, রাজশাহী।

বিষয়: বিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা দিবস’ এর অনুষ্ঠানমালা সম্পর্কে প্রতিবেদন।

মহোদয়,

এখানে বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করবেন।

প্রতিবেদকের নাম ও ঠিকিনা:

প্রতিবেদনের শিরোনাম: ‘ক’ স্কুলে ‘স্বাধীনতা দিবস’ উদযাপিত।

তৈরির তারিখ:

প্রতিবেদন তৈরির সময়:

 

আরও পড়ুন:
 

 

প্রতিবেদনের একটি উদাহরণ দাও

 

নিচে উদাহরণস্বরূপ একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো:

* মাদকাসক্তি নিসনকল্পে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন কর।

বরাবর,

সম্পাদক

দৈনিক যুগান্তর

ঢাকা।

জনাব,

আপনার বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগান্তর প্রত্রিকার ‘মাদকামুক্ত সুন্দর জীবন চাই’ শীর্ষক পত্রখানা চিঠিপত্র কলামে প্রকাশ করে বাধিত করবেন।

বিনীত

মোঃ সোহেল ইসলাম

বাংলাবাজার, ঢাকা।

তারিখ: ০৪/০৫/২০২৩

‘মাদকমুক্ত সুন্দর জীবন চাই’

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য যে, সৃষ্টির সেরা সে জীবগুলো আজ নেশাগ্রস্ত হয়ে নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হতে চলেছে। সারা বিশ্ব আজ মাদকদ্রব্যের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত। মাদকাসক্তির কবলে পড়ে শিক্ষা, সতত, মানবিকতা, প্রগতি আজ ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গোটা তরুণ সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে। ফলে ক্রমশই ভেঙে পড়ছে শান্তিময় সমাজ কাঠামো। সন্ত্রাস আর অনাচার আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। অথচ এদিকে তাকানোর যেন কারও কোন অবকাশ নেই। আমরা যেন জেনেশুনেই সভ্যজগৎ থেকে দূড়ে চলে যাচ্ছি। মাদকাসক্তদের কবল থাবা আজ সমাজের এমন কোন স্থান নেই যেখানে ছায়া ফেলেনি। মাদকদ্রব্য আজ দেশের যত্রতত্র বিচরণ করছে। অবাধ তার গতি, ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া একে রোধ করার শক্তি যেন কারও নেই।

তরুণ সমাজ আজ দিশেহারা, শিক্ষার পরিবর্তে আজ তাদের হাতে উঠে আসছে মদের বোতল, ফেনসিডিল, প্যাথেড্রিন ইনজেকশন, হেরোইনসহ আরও অনেক জীবনবিনাশী নেশাদ্রব্য। এভাবে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ তরুণের জীবন। সংসার জীবনে নেমে আসছে অমানিশার করাল গ্রাস। কিন্তু এ অবস্থার প্রতিবিধান করতে না পারলে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।

সারা বিশ্বে আজ মাদকদ্রব্যের  বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। তবে এগুলোর অনেকটাই লোক দেখানো ঢং বলে মনে হয়। কাজেই আজ আর আমাদের অন্যের দিকে তাকালে চলবে না। সময় এসেছে শক্ত হাতে মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূল করে তরুণ সমাজ তথা দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের রক্ষা করার। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এ মুহূর্ত থেকেই রতুণ সমাজকে সুস্থ-সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং জাতির সুখ সমৃদ্ধির জন্য দলমত নির্বিশেষে মহলায় মহলায় মাদক প্রতিরোধ সংঘ গড়ে তুলে মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত।

মো: সোহেল ইসলাম

 

পরিশেষে, এই ’প্রতিবেদন কাকে বলে? । প্রতিবেদন লেখার নিয়ম উদাহরণ সহ ২০২৪’ আর্টিকেলটিতে প্রতিবেদন সম্পর্কে যেসব বিষয় নিয়ে উপরে আলোচনা করা হলো আশাকরি তা একটু হলেও আপনার উপকারে এসেছে।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment