মিজানুর রহমান আজহারী সম্প্রতি তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কদরের রাতে যে ৫টি আমল করতেন’ সে বিষয়ের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ভিডিওতে তিনি যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন সে বিষয়ে নিচে জানানো হলো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কদরের রাতগুলোতে কী কী ইবাদত করতেন?
মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, আমি খুঁজে ৫টি আমলের কথা পেয়েছি বিশেষভাবে। রাসুল (সা.) বলেছেন: “مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ” (যে কদরের বরকত ও খায়ের থেকে বঞ্চিত হলো, সে আসলেই বঞ্চিত)। He is the loser. সে হতভাগা, সে পোড়াকপাল।
Last ten days of Ramadan খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে Cream time of Ramadan। এটা রমাদানের একেবারে মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দশ দিনের যেকোনো রাতের যেকোনো রাত কদর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে odd nights গুলো: ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯। বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে, আমরা যেন রমাদানের শেষ দশ রাতে লাগাতার একইভাবে একই speed-এ ইবাদত করি।
১. সারারাত জেগে ইবাদত ও পরিবারকে জাগানো
তিনি সারারাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের লোকদেরকে ঘুমাতে দিতেন না, উঠিয়ে দিতেন। বছরের অন্য কোনো সময়ে সারারাত জেগে ইবাদত করার কোনো নজির রাসুল (সা.)-এর জীবনে ছিল না। আমি ইতিপূর্বে একটি convention-এ The Daily Routine of Prophet (SM) নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে আমরা বলেছি যে, রাসুল (সা.)-এর দৈনন্দিন অভ্যাস ছিল তিনি এশার পরেই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং midnight-এ উঠতেন। কিন্তু except the last ten days of Ramadan, তিনি ঘুমাতেন না।
আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন:
“إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ أَحْيَا اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَجَدَّ وَشَدَّ الْمِئْزَرَ”
(যখন রমাদানের শেষ দশ দিন আসত, রাসুল (সা.) সারারাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে তুলতেন এবং কোমরে শক্ত করে কাপড় বাঁধতেন।)
এখানে ‘মিজার’ বা লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ইবাদতে মগ্ন হতেন। শেষ দশ দিনে আমরাও একটি special plan করতে পারি যেন এই বরকত হাসিল হয়।
২. ইতিকাফ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) রমাদানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন: “كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ” (ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি এই আমল জারি রেখেছেন)। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করবেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেছিলেন। ইতিকাফ করতে না পারলেও শেষ দশকের রাতগুলো যেন আমরা মসজিদে বা ইবাদতে কাটানোর চেষ্টা করি।
৩. জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআন রিভিশন
রাসুল (সা.) এবং জিবরাঈল (আ.) যৌথভাবে কুরআন রিভিশন করতেন। সারা বছর যা নাজিল হতো, রমাদানে জিবরাঈল (আ.) রাসুল (সা.)-কে শোনাতেন এবং রাসুল (সা.)-ও তাঁকে শোনাতেন।
- বুখারির বর্ণনায়: “وَكَانَ جِبْرِيلُ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ”
- মুসলিম শরীফের বর্ণনায়: “أَنَّ جِبْرِيلَ كَانَ يُعَارِضُهُ بِالْقُرْآنِ كُلَّ عَامٍ مَرَّةً”
এই last ten days of Ramadan-এ আমাদের উচিত কুরআনের সাথে attachment বাড়ানো—সেটা তেলাওয়াত, অর্থ পড়া বা Tadabbur-e-Quran যেকোনোভাবেই হতে পারে।
৪. কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ)
রাসুল (সা.) কদরের রাতের সাথে কিয়ামুল লাইলকে বিশেষভাবে যুক্ত করেছেন। বুখারির বর্ণনায় এসেছে:
“مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ” (যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়ামুল লাইল করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।)
আমরা যেন লম্বা সময় দাঁড়িয়ে, দীর্ঘ রুকু ও সেজদার মাধ্যমে এই নামাজ আদায় করি। কারণ বান্দা যখন সেজদায় থাকে, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে।
৫. বেশি বেশি দোয়া করা
এই রাতগুলোতে রাসুল (সা.) খুব বেশি বেশি দোয়া করতেন। দোয়া হতে হবে অত্যন্ত আন্তরিক, কোনো robotic দোয়া যেন না হয়। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই, তবে কী বলব?” রাসুল (সা.) তাকে এই দোয়াটি শিখিয়ে দিলেন:
“اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي” (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।)
এই দোয়াটি very precise in wording but comprehensive in meaning। এতে আগে আল্লাহর প্রশংসা করা হয়েছে, তারপর তাঁর প্রিয় কাজ (ক্ষমা করা) এর উসিলায় নিজের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে।
এই রিমাইন্ডারগুলো যেন আমরা রমাদানের পরেও অব্যাহত রাখি।
বি.দ্র: আপনি চাইলে এখানে “কদরের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বিশেষ ৫টি আমল” ক্লিক করে ফেসবুক থেকে মিজানুর রহমান আজহারীর মূল ভিডিওটি দেখে আসতে পারেন।
আরও পড়ুন:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর যিকির ও আমল (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ)
- সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দু’আ ও ফজিলত
- ভুল ধারণার অবসান! এই ৯টি কাজ করলেও আপনার রোজা ভাঙবে না
পরিশেষে বলা যায়, কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এই কদরের রাত আমাদের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই শেষ ১০টি দিন যেভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন, তা আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। মিজানুর রহমান আজহারী সাহেবের আলোচনা থেকেও আমরা যে ৫টি আমল সম্পর্কে জানলাম, তাঁর মূল লক্ষ্যই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ক্ষমা পাওয়া। তাই আসুন, আমরা সবাই অলসতা না করে রমজানের এই শেষ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগাই এবং মহান আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের বরকত নসিব করুন। আমিন।



