নাক ডাকা বন্ধ করার ১৩টি কার্যকরী উপায় ও ব্যায়াম

ইংরেজি Snoring শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে নাক ডাকা। রাতে ঘুমানোর সময় আপনার পাশে থাকা ব্যক্তিটি যদি হঠাৎ করেই নাক ডাকতে শুরু করে তা অনেকের কাছেই বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়ায়।

কারণ, ঘুমের ভেতর পাশে থাকা কেউ নাক ডাকলে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে এবং ভালো ভাবে ঘুমাতেও পারবেন না। আপনি যদি নাক ডেকে থাকেন আপনার পাশে থাকা লোকটি বিরক্তি বোধ করতে পারে।

অথবা আপনি যদি কোথাও মেহবান খেতে যান বা ঘুরতে যান সেখানেও যদি আপনি ঘুমের ভেতর নাক ডেকে থাকেন তবে আপনি বিরক্তির কারন বা হাসির কারন হতে পারেন।

আপনি চাইলে কিছু ঘোরয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে সহজেই আপনার নাক ডাকার সমস্যা কমিয়ে আনতে পারেন বা ভালো করতে পারবেন।

সেজন্যই মূলত এই আর্টিকেলে আমি নাক ডাকা বন্ধ করার ১৩টি কার্যকরী উপায় এবং নাক ডাকা বন্ধ করার মুখের ৬টি ব্যায়াম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

তাই দেরী না করে চলুন মূল আলোচনা শুরু করা যাক।

 

মানুষ কি কি কারণে নাক ডেকে থাকে?

 

বিভিন্ন কারণে একজন মানুষ নাক ডেকে থাকে। সবাই যে একই কারণে নাক ডেকে থাকে বিষয়টা এমন নয়। একেক জনের নাক ডাক কারন একেক রকম হতে পারে।

চলুন নিচে থেকে মানুষ কি কি কারণে নাক ডেকে থাকা তা জেনে নেওয়া যাক।

মানুষ যেসব কারণে নাক ডেকে থাকে:

  • ঠান্ডা বা সর্দি লাগার ফলে মানুষ নাক ডাকতে পারে।
  • সাইনাসে ইনফেকশন থাকলে মানুষ নাক ডাকতে পারে।
  • টনসিল এর সমস্যা থাকলে মানুষ নাক ডাকতে পারে।
  • নেসাল  পলিপের সমস্যা থাকলেও মানুষ নাক ডাকতে পারে।

এ যাবতীয় সমস্যা ছাড়াও কিন্তু একজন সুস্থ্য মানুষও নাক ডাকতে পারে। এর পিছনেও কিছু কারণ রয়েছে।

যেমন: আমরা যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নেই তখন নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় শ্বাস পথে যদি কোনে বাধা পায় তখন একজন মানুষ নাক ডাকতে পারে।

কারণ, আমাদের গলার পিছনের দিকে বা জ্বিভের পিছনের দিকে যে মাসেল রয়েছে তা কোন কারণে যদি রিলাক্স হয়ে যায় বা ডিলা হয়ে যায় তখন শ্বাস নেওয়ার সময় সে বায়ুটি সেই মাসেলে গিয়ে বাধা প্রাপ্ত হয়। এবং মাসেলের মধ্যে গিয়ে যখন ধাক্কা মারে তখন সেই মাসেলটি ভাইব্রেশন হয়। আর মাসেলটি যখন ভাইব্রেশন হয় তখন নাক ডাকার মতোন আওয়াজ আমরা শুনতে পেয়ে থাকি।

তাছাড়াও নাক ডাকার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে অ্যালকোহল। অ্যালকোহল খাওয়ার সাথে সাথে আমাদের গলার বা জ্বিভের পিছনের দিকের মাসেল গুলো খুব রিলাক্স হয়ে যায় যার ফলেও নাক ডাকার প্রবণতা দেখা যায়।

এসব ছাড়াও আপনার ওজন যদি হিসেবের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও কিন্তু আপনি নাক ডাকতে পারেন।

 

নাক ডাকা বন্ধ করার ১৩টি কার্যকরী উপায়

 

নাক ডাকা বন্ধ করার অনেক ঘরোয়া উপায় রয়েছে যা অবলম্বন করে ঘরে বসেই খুব সহজে নাক ডাকা কমিয়ে আনা বা বন্ধ করতে সক্ষম হবেন।

নিচে নাক ডাকা বন্ধ করার ১৫টি কার্যকরী উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

 

১. ঘর ও বিছানাপত্র পরিষ্কার রাখুন

 

আপনার ঘর ও বিছানাপত্রে যদি ধূলা-ময়লা জমে থাকে তা নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নাকের নালিতে সংক্রমিত হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। আর সংক্রমিত হয়ে গেলে আপনার নাকের পেশি ফুলে উঠতে পারে। যার ফলে আপনার নাক ডাকার প্রবণতা শুরু হওয়ার সম্ভবনা থাকে।

সেজন্য আপনার ঘর ও বিছানা সব সময় পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রেখে নাক ডাকার প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

 

২. অ্যালকহোল থেকে বিরত থাকতে হবে

 

আমি উপরে একটু আগে বলেছি যে, অ্যালকহোলের ফলে আমাদের গলার বা জ্বিভের পিছনের মাসেল গুলো রিলাক্স হয়ে যায় এবং এর ফলে নাক ডাকার প্রবণতা শুরু হতে পারে।

সেজন্য আপনার যদি এমন কোন অভ্যাস থেকে থাকে আর আপনি নাক ডাকা বন্ধ করতে চান তবে আপনাকে অ্যালকহোল থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

৩. ঘুমানোর সময় মাথা উচু যায়গায় রাখুন

 

ঘুমানোর সময় মাথা সমান যায়গায় রাখলে অনেকের শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। ফলে অনেকেই নাক ডেকে থাকেন। তাই প্রয়োজনে ঘুমানোর সময় একটির যায়গায় আপনি দুটো বালিশ মাথার নিচে নিয়ে ঘুমাতে পারেন।

এতে করে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসে কোন বাধাও পাবে না এবং আপনার নাক ডাকাও কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে।

 

৪. ধূমপান পরিহার করুন

 

আমরা জানি যে ধূমপান আমাদের শরীরের অনেক ক্ষতি সাধন করে থাকে। সেই সাথে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হয়ে থাকে।

আর এই শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা থেকেই নাক ডাকার প্রবণতা শুরু হতে পারে।

সেজন্য আপনার যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে এবং আপনি নাক ডেকে থাকেন তবে আপনাকে ধূমপান পরিহার করতে হবে। আশাকরি এতে আপনার নাক ডাকা কমে আসবে বা বন্ধ হয়ে যাবে।

তাছাড়া ধূমপান ছাড়লে আপনার শরীরের সার্বিক উন্নতি ঘটবে।

 

৫. একপাশ হয়ে শোয়া

 

সোজা বা চিৎ হয়ে শোয়ার ফলে আমাদের জ্বিভ ভিতরের দিকে চলে যায়। আর জ্বিভ ভিতরের দিকে চলে যাওয়ায় আমরা শ্বাস নেওয়ার সময় তা শ্বাসপথে বাধা প্রাপ্ত হয়। ফলে নাক ডাকা শুরু হতে পারে।

তাই শোয়ার এই অভ্যাসটিকে পরিবর্তন করে চেষ্টা করবেন যে কোন এক পাশ হয়ে শোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার। এতে করে আপনার নাক ডাকার প্রবণতা কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে।

 

৬. বয়সের সাথে ওজনের সামঞ্জস্য রাখা

 

অনেকের বয়সের সাথে ওজনের কোন সামঞ্জস্য থাকে না। তাদের ওজন প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। যার ফলে তাদের নাক ডাকার প্রবণতা শুরু হতে পারে বা হয়েছে।

সেজন্য আপনি চেষ্টা প্রয়োজনে শারিরীক ব্যায়াম করে হলেও বয়সের সাথে আপনার ওজনের একটা সামঞ্জস্য রাখার। এতে করে আপনার নাক ডাকার প্রবণতা কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে।

 

আরও পড়ুন: বি এম আই কিভাবে বের করব? । উচ্চ অনুযায়ী নারী ও পুরুষের বিএমআই চার্ট

 

৭. নাক দিয়ে আওয়াজ করছেন নাকি গলা দিয়ে

 

অনেকে মনে করেন প্রত্যেকে নাক দিয়েই আওয়াজ করেন। কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। অনেকে নাক দিয়ে আওয়াজ করেন আবার অনেকে আওয়াজ বা শব্দ করেন গলা দিয়ে। আবার অনেকেই নাক ও গলা দুটোর মাধ্যমেই আওয়াজ করে থাকে।

তাই প্রথমে আপনি নিশ্চিত হোন যে আপনি কিসের মাধ্যমে আওয়াজ করছেন নাক নাকি গলা।

এটি বের করতে পারলে নাকের জন্য ড্রপ আছে এবং গলার জন্য যে স্প্রে আছে এই দুটোর মধ্যে আপনি একটিকে বাদ দিতে পারবেন।

 

৮. অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন

 

অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে আমাদের পাকস্থলিতে শুরু হয় এ্যাসিডিটির প্রতিক্রিয়া। আর এমন অনেক গবেষণাতেই দেখা গিয়েছে যে এ্যাসিডিটির সাথে নাক ডাকার একটা সম্পর্ক রয়েছে।

তাই আপনি যদি আপনার নাক ডাকার কারণ খুঁজে না পান তবে আপনি কিছুদিন কম মসলাযুক্ত খাবার খেয়ে দেখতে পারেন যে আপনার নাক ডাকার কারণ কি।

 

৯. দুধের সাথে হলুদ মিশিয়ে পান করুন

 

অ্যান্টিবায়োটিক ও এন্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্যে ভরপুর হচ্ছে হলুদ। যা আপনার নাক ডাকার প্রবণতা কমানোর জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

তাই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস দুধের সাথে অল্প পরিমাণ হলুদ মিশিয়ে তা পান করুন। এবং লক্ষ করুন যে আপনার নাক ডাকার প্রবণতা কমছে কিনা।

 

১০. ঘুমানোর আগে নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করুন

 

অনেক সময় ঘুমানোর আগে নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করে না ঘুমানোর জন্য নাক বন্ধ হয়ে থাকে এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফলে অনেকেই নাক ডেকে থাকেন।

সেজন্য রাতে যখন ঘুমাতে যাবেন নাক ভালো ভাবে ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিয়ে ঘুমাবেন।

 

১১. পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করবেন

 

শরীরে যেন পানির ঘাটতি না পরে সেজন্য আপনি সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করবেন। এতে আপনার নাকও হাইড্রেটেড থাকবে।

যার ফলে আপনার নাক ডাকার পরিমাণও কমে যাবে।

 

১২. পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাতে হবে

 

যাদের ঘুম হয় না ভালো করে তাদের শরীরে নানা রকম বাসা বাধেঁ এবং ভালো করে ঘুম না হওয়ার ফলেও মানুষ বেশি করে নাক ডেকে থাকে।

সেজন্য আপনার প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

 

১৩. গরম পানির ভাপ নিতে পারেন

 

ঘুমের ভেতর নাক ডাকার অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে নাসিকা পথে রক্ত জমাট বেধে থাকা। আর নাসিকা পথে রক্ত জমাট বেধে থাকার কারণে শ্বাস নেওয়ার সময় শ্বাস বাধা প্রাপ্ত হয় যার ফলে মানুষ ঘুমের ভেতর নাক ডেকে থাকেন।

তাই প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে গরম পানির ভাপ নিতে পারেন যা আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে তুলবে।

 

নাক ডাকা বন্ধ করার মুখের ৬টি ব্যায়াম

 

নাক ডাকা বন্ধ করার জন্য মুখের কিছু ব্যায়াম যা আপনি নিয়মিত করলে আপনার নাক ডাকার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাবে।

সেজন্য নিচে নাক ডাকা বন্ধ করার জন্য মুখের ৬টি ব্যায়াম দেওয়া হলো।

নাক ডাকা বন্ধ করতে মুখের ৬টি ব্যায়াম:

  • আপনার জ্বিভকে যতটা সম্ভব বাইরের দিকে বের করবেন এবং ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন তারপর জ্বিভটিকে আবার আস্তে করে ভিতরে নিয়ে যাবেন। এই একই কাজ এক সাথে তিনবার করবেন।
  • আপনার জ্বিভটিকে যতটা সম্ভব ভেতরের দিকে টেনে নিবেন। এতে করে আপনার গলার ভেতরে যে মাসেল রয়েছে তাতে যথেষ্ট টান লাগবে। যার ফলে আপনার গলার বা জ্বিভের পিছনের মাসেল গুলো স্ট্রোং বা শক্ত হয়ে যায়। জ্বিভটা যখন ভিতরের দিকে নিয়ে যাবেন তখন চেষ্টা করবেন মুখটা বন্ধ রেখে এটা করার। এতে এই কাজটি আরও কার্যকরী হবে। জ্বিভটা ভিতরে নিয়ে ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন এবং এই একই কাজ একসাথে তিনবার করবেন।
  • আপনার ডান পাশের গালে দুটো আঙুল রাখবেন এবং ভিতর থেকে জ্বিভে দিয়ে তা বাইরের দিকে ঠেলে ধরে ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন এবং এই একই কাজ একসাথে তিন বার করবেন। আবার এই একই কাজ বাম পাশের গালে দুটো আঙুল রেখে করবেন।
  • জ্বিভকে দাতের নিচের পাটিতে রেখে উপরের দিকে ঠেলে ধরে ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন এবং এই অবস্থায় দুই বার ডোক গিলবেন। আর এই একই কাজ এক সাথে তিনবার করবেন।
  • জ্বিভকে উপরের তালুতে লাগিয়ে ঠেলে ধরবেন ও ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন এবং এই অবস্থায় দুইবার ডোক গিলবেন।
  • আপনার গলাটিকে একটু টান টান করে রাখবেন এবং ৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করবেন। আর এই একই কাজ একসাথে তিনবার করবেন। অর্থাৎ, ৫ সেকেন্ড, ৫সেকেন্ড, ৫ সেকেন্ড করে তিনবার।

 

এই ব্যায়ামটি কিছুদিন করার পরে আপনার মুখে, জ্বিভের পিছন দিকের অংশে বা গলাতে কিছুটা ব্যাথা অনুভব করতে পারেন। এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। এক্সসারসাইজ গুলো ২০-২৫ চালিয়ে যাওয়ার পর আপনি নিজেই ফলাফল বুঝতে পারবেন যে আপনার নাক ডাকা কমেছে কিনা।

পরিশেষে, এই আর্টিকেলে আমি চেষ্টা করেছি নাক ডাকা বন্ধ করার ১৩টি কার্যকরী উপায় সম্পর্কে আপনাদের জানাতে এবং নাক ডাকা বন্ধ করার মুখের ৬টি ব্যায়াম সম্পর্কে আপনাদের জানাতে। আশাকরি উপরোক্ত নিয়ম ও ব্যায়াম গুলো অনুসরণ করলে আপনি নাক ডাকার সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবেন।

এতেও যদি এই নাক ডাকার সমস্যার সমাধান না হয় তবে আপনি একজন নাক-কান-গলারোগ সার্জনের কাছে গিয়ে তার পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে আপনার নাক ডাকা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment