কোন ফ্রিজ ভালো তা কিভাবে বুঝবো? [গুরুত্বপূর্ণ ১২টি উপায়]

ঘরে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মতোন এখন ফ্রিজও প্রায় প্রত্যেকেরেই প্রয়োজন হয়।

কারণ অনেকে আছেন প্রতিদিন বাজার করতে আগ্রহী নন। তারা একদিনে অনেক বাজার করে এনে ফ্রিজে রেখে দেয়। এবং তা অনেকে দিন পর্যন্ত ভালো থাকে যার ফলে প্রতিদিন বাজার করার প্রয়োজন হয় না।

এখন সমস্যা হচ্ছে আমরা যখন ফ্রিজ কিনতে যাই তখন ফ্রিজের ভালো দিক ও মন্দ দিক গুলো সম্পর্কে না জেনেই অনেকে ফ্রিজ কিনে থাকি। পরবর্তীতে তখন সেসব ফ্রিজে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে থাকে যা অনেকের কাছেই বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়ায়।

সেজন্য এই আর্টিকেলে আমি কোন ফ্রিজ ভালো তা কিভাবে বুঝবো এ বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং ভালো ফ্রিজ চেনার ১২টি উপায় সেয়ার করেছি। যা আপনার জানা থাকলে ফ্রিজ কিনতে গিয়ে কোনোদিন ঠকবেন না।

তাই আর দেরী না করে চলুন কোন ফ্রিজ ভালো তা কিভাবে বুঝবো বা ভালো ফ্রিজ চেনার নিয়ম বা উপায় গুলো জেনে নেই।

 

ভালো ফ্রিজ চেনার ১২টি নিয়ম বা উপায় নিচে দেওয়া হলো:

 

১: ফ্রিজের কনডেন্সর কিসের তৈরি?

 

সাধারণত ফ্রিজের কনডেন্সর দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা:

১. কপার কনডেন্সার যুক্ত ও

২. স্টিল কনডেন্সার যুক্ত।

আপনি যে ফ্রিজটি কিনবেন দেখবেন সেটির কনডেন্সার যেন কপার কনডেন্সার যুক্ত হয়। কারণ, কপার কনডেন্সার যুক্ত ফ্রিজ অনেক টেকসই হয়ে থাকে এবং এটি অনেক বিদ্যুত সাশ্রয়ীও হয়ে থাকে। তাছাড়াও কপার কনডেন্সার যুক্ত ফ্রিজের কম্প্রেসরের সাথে তামার তৈরি কুলিং সিস্টেম পাইপ থাকে যা ফ্রিজের পেছনের দিবে ও বডির ভেতরের দিকে থাকে।

কপার কনডেন্সার ‍যুক্ত ফ্রিজের গ্যাস লিকেজ হয় না, ক্যাপেলরি জ্যাম হয় না, মরিচাও পরে না এবংকি ফ্রিজের ভেতরেও দ্রুত ঠান্ডা হয়।

তাই ফ্রিজ কেনার পূর্বে শোরুম থেকে জেনে বা দেখে নিবেন যে আপনি যে ফ্রিজটি নিতে চাচ্ছেন সেটির কনডেন্সর কিসের তৈরি

 

২: ফ্রিজের কম্প্রেসর কী বা কেমন?

 

কম্প্রেসরকে বলা হয় ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটরের মূল ইঞ্জিন।  ফ্রিজ কেনার পূর্বে এই কম্প্রেসরের বিষয়টি ভালো ভাবে মাথায় রাখবেন।

কারণ, আপনার ফ্রিজের কম্প্রেসর যত উন্নত মানের ও ভালো হয়ে থাকবে আপনার ফ্রিজ ততই টিকসই হবে এবং ভালো সার্ভিস দেবে।

সহজ কথায়, আপনার ফ্রিজের কম্প্রেসর যত উন্নত হবে, আপনার ফ্রিজটিও ততই ভালো হবে।

আর আপনি যদি নিম্ন মানের কম্প্রেসর যুক্ত ফ্রিজ কিনেন তবে আপনাকে প্রায় দিনই এই ফ্রিজ নিয়ে নিত্য নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে যা অনেক বিরক্তিকর ও ঝামেলার। তাছাড়া নিম্ন মানের কম্প্রেসর যুক্ত ফ্রিজ টিকসই কম হবে এবং বিদ্যুৎ বিলও বেশি আসবে।

 

৩: ফ্রিজটি ফ্রস্ট নাকি নন ফ্রস্ট?

 

যেসব ফ্রিজে খাবার রাখলে তাতে বরফ জমে যায় সেগুলোকে বলা হয় ফ্রস্ট ফ্রিজ এবং যেসব ফ্রিজে খাবার রাখলে তাতে বরফ জমে না সেগুলোকে বলা হয় নন ফ্রস্ট ফ্রিজ।

ফ্রস্ট ফ্রিজে খাবার রাখলে তাতে বরফ জমে যায় জন্য যদি অনেক সময়ও বিদ্যুৎ না থাকে খাবার তেমন নষ্ট হয় না। তাছাড়া ফ্রস্ট ফ্রিজ অনেক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ীও হয়ে থাকে।

অন্যদিকে নন ফ্রস্ট ফ্রিজে খাবার রাখলে তাতে বরফ জমে না জন্য যদি কারেন্ট ২-৩ ঘণ্টা না থাকে তাতেই খাবার আর ভালো থাকে না। তাছাড়া নন ফ্রস্ট ফ্রিজে বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার যে আপনি ফ্রস্ট ফ্রিজ কিনবেন নাকি নন ফ্রস্ট ফ্রিজ কিনবেন।

 

৪: ফ্রিজটি স্মার্ট ফ্রিজ নাকি পুরোনো মডেলের ফ্রিজ?

 

স্মার্ট ফ্রিজে ব্যবহারিত হয় বিশেষ একধরনের ইনভার্টার প্রযুক্তি। যার ফলে আপনার ফ্রিজের ডিপ অংটিকে নরমালে রূপান্তর করে নিতে পারবেন। আবার চাইলে পুনরায় সেটিকে ডিপে রূপান্তর করতে পারবেন।

এসব ছাড়াও স্মার্ট ফ্রিজে রয়েছে পাওয়ার সেভিংস মুড (Power Savings Mode)। স্মার্ট ফ্রিজে পাওয়ার সেভিংস মুড থাকায় আপনি বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

যেমন: রাতের বেলায় কিন্তু ফ্রিজ কম খোলা হয়ে থাকে, এমন সময় যদি আপনি পাওয়ার সেভিংস মুডটি অন করে রাখেন তাহলে আপনার অনেক বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

তাছাড়া কোথাও যদি বেড়াতে যান তখনও এই পাওয়ার সেভিংস মুডটি অন করে রেখে যেতে পারেন। তাতে আপনার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

 

৫: ফ্রিজে ন্যানো হেলথকেয়ার টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা?

 

ফ্রিজে খাবার ভালোভাবে শুধু সংরক্ষিত থাকাটাই বড় কথা নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আপনি ফ্রিজ যেসব খাবার রাখছেন সেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত থাকছে কিনা ফ্রিজে তা নিশ্চিত করা।

ফ্রিজের খাবারকে জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে ফ্রিতে ব্যবহার করা হয় ন্যানো হেলথকেয়ার টেকনোলজি (Nano Health Care Technology) ।

আপনি যে ফ্রিজটি পছন্দ করেছেন সেটিতে ন্যানো হেলথকেয়ার টেকনোলজি রয়েছে কিনা তা জানার জন্য আপনি শোরুম কর্তৃপক্ষের কাউকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।

অথবা, ফ্রিজের গায়ে যে একটি স্টিকার থাকে সেখান থেকেও আপনি জানতে পারবেন যে আপনি যে ফ্রিজটি পছন্দ করেছেন তাতে ন্যানো হেলথকেয়ার টেকনোলজি রয়েছে কিন।

 

৬: কেমন সাইজের বা আকারের ফ্রিজ কিনবেন?

 

টাকা থাকলেই যে বড় সাইজের বা আকারের ফ্রিজ কিনতে হবে এমন কথা নেই। কারণ, বড় মাপের ফ্রিজে ছোট আকারের তুলনায় বিদ্যুৎ খরচ বেশি হয়ে থাকে।

আপনার পরিবারে সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী ছোট, মাঝারি বা বড় আকারের ফ্রিজ কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

 

৭: ফ্রিজের ডিপ অংশ ও নরমাল অংশের আকার কেমন কিনলে ভালো হবে?

 

অনেকে বুঝে না বুঝে ফ্রিজ কিনে নিয়ে আসে এবং পরে দেখে যে তার ডিপ অংশ বা নরমাল অংশ যতটা রয়েছে ততটার প্রয়োজন পরে না। যার ফলে ডিপ অংশ বা নরমাল অংশের অনেকটা যায়গাই ফাঁকা পরে থাকে।

তাই আপনি যখন ফ্রিজ কিনতে যাবেন তখন এই বিষয়টি মাথায় রাখবেন যে ফ্রিজের কোন অংশটি আপনার বেশি ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে। যদি ফ্রিজের ডিপ অংশ বেশি প্রয়োজন হয় তবে ফ্রিজের ডিপ অংশ বড় দেখে কিনবেন। অথবা যদি ফ্রিজের নরমাল অংশ বেশি প্রয়োজন হয় তবে ফ্রিজের নরমাল অংশ বড় দেখে কিনবেন। এতে করে ফ্রিজের ভিতর যায়গা অহেতুক ফাঁকা পরে থাকবে না।

 

৮: ফ্রিজের ডিপ অংশ উপরে থাকা ভালো নাকি নিচে থাকা ভালো?

 

ফ্রিজের ডিপ অংশে আমরা সাধারণত ভারী জিনিস পত্র রেখে থাকি। যদি ফ্রিজের ডিপ অংশ ফ্রিজের উপরের অংশে থাকে তাহলে তাতে যখন ভারী জিনিস পত্র দিয়ে পূর্ণ করে ফেলবেন তখন ফ্রিজের ভারসাম্য অনেক সময় ঠিক থাকে না।

আর ফ্রিজের ডিপ অংশ নিচের দিকে থাকলে তাতে ভারী জিনিসপত্র দিয়ে পূর্ণ করে ফেললেও ফ্রিজের ব্যালেন্স ঠিক থাকে। এবং ফ্রিজে খাবার রাখা ও বের করাও অনেক সহজ হয়।

তাই ফ্রিজের নিজের দিকেই ডিপ অংশ থাকাটাই ভালো (ব্যক্তিগত মতামত) বাকিটা আপনার খুশি।

 

৯: আপনার পছন্দের ফ্রিজটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কিনা?

 

যেহেতু ফ্রিজে সব সময়ই বিদ্যুতের সাথে সংযোগ দেওয়া থাকে তাই আপনার উচিত ফ্রিজ কেনার পূর্বে অবশ্যই জেনে নেওয়া যে আপনি ফ্রিজটি কিনছেন সেটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কিনা।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্রিজ গুলো পরিবেশ বান্ধব হয়ে থাকে। এবং প্রতিমাসে আপনার বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণও কম আসবে।

আপনার ফ্রিজটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কিনা তা জানার সহজ একটি রয়েছে। নিয়মটি হচ্ছে আপনার ফ্রিজের গায়ে নির্দিষ্ট যায়গায় দেখুন  যে কোন স্টার (*) চিহ্ন আছে নাকি।

যদি আপনার ফ্রিজের নির্দিষ্ট যায়গায় স্টার চিহ্ন থাকে তাহলে সেই ফ্রিজটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হয়ে থাকবে।

আর যদি স্টার চিহ্ন না দেওয়া থাকে তাহলে সেই ফ্রিজটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নাও হতে পারে।

 

১০: ফ্রিজের গায়ে R600a Gas লেখা আছে কিনা?

 

অনেক ফ্রিজে R134a গ্যাস লেখা থাকে যা অনেক পুরাতন একটি গ্যাস। এই R134a গ্যাস  ব্যবহারিত ফ্রিজ আপনার বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দিবে।

তাই ফ্রিজ কেনার সময় সেই ফ্রিজে R600a গ্যাস লেখা আছে কিনা তা দেখে কিনুন।

কারণ, R600a গ্যাসটি অনেক উন্নত মানের একটি গ্যাস। এই গ্যাস ব্যবহৃত ফ্রিজ গুলো দ্রুত ঠান্ডা হয়ে থাকে। এবং আপনার বিদ্যুৎ বিলও অনেক সাশ্রয় করবে।

এসব বাদেও R600a গ্যাস ব্যবহৃত ফ্রিজ গুলো পরিবেশ বান্ধব হয়ে থাকে।

 

১১: ফ্রিজের গ্যারান্টি, ওয়ারেন্টি ও কিস্তির তথ্য সম্পর্কে জানতে হবে

 

যে কোন ফ্রিজ কেনার পূর্বে শোরুম কর্তৃপক্ষের সাথে বসে ফ্রিজের গ্যারান্টি, ওয়ারেন্টি ও কিস্তির তথ্য সমূহ নিয়ে ভালো ভাবে জেনে নিতে হবে।

আপনি যে ফ্রিজটি কিনবেন সেটিতে কত দিনের গ্যারান্টি রয়েছে বা কতদিনের জন্য ওয়ারেন্টি দিবে সেসব বিষয় সম্পর্কে ফ্রিজ কেনার আগেই জেনে নিবেন যাতে পরবর্তীতে কোন প্রকার ঝামেলার সম্মুখীন হতে না হয় আপনাকে।

বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানিই কিস্তিতে ফ্রিজ বিক্রি করে থাকে। আপনি যদি কিস্তিতে ফ্রিজ কিনতে চান তবে শোরুম কর্তৃপক্ষ বা কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সাথে বসে ভালো ভাবে কিস্তির বিষয়ে জেনে নিবেন যে ফ্রিজ কিনলে কত টাকার কিস্তি দিতে হবে, কত দিন কিস্তি দিতে হবে বা কত টাকা করে কিস্তি পরিশোধ হবে

তাছাড়াও কিস্তিতে ফ্রিজ কেনার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিবেন যা পরবর্তীতে কোন ঝামেলা না হয়।

 

১২: ফ্রিজের ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের কিনা?

 

আপনি যে ফ্রিজটি কিনবেন বা কিনতে চাচ্ছেন সেটির ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের কিনা তা যাচাই করে নিবেন।

ফ্রিজের ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের না হলে তাতে খাবার রাখলে কয়েকদিনের ভেতরেই খাবার থেকে গন্ধ বের হয়।

তাই এ সমস্যা এড়াতে ফ্রিজ কেনার পূর্বে শোরুম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নিবেন আপনি যে ফ্রিজটি কিনতে চাচ্ছেন সেটির ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের কিনা।

 

পরিশেষে, আমি এই আর্টিকেলে ভালো ফ্রিজ চেনার ১২টি নিয়ম বা উপায় আপনাদের সাথে সেয়ার করলাম। আশাকরি ফ্রিজ কেনার সময় যদি আপনি সচেতন ভাবে উপরে আলোচিত বিষয় ‍গুলো সম্পর্কে খতিয়ে দেখেন তাহলে ফ্রিজ কিনতে গিয়ে আর ঠকবেন।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment