চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া ১৭টি সহজ উপায় ও চিকিৎসা

শুধু যে আপনার চুল পড়ছে বিষয়টা এমন নয়। প্রায় অধিকাংশ মানুষই এই চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগেছেন বা ভুগছেন।

মাথার চুল পড়ার পেছনে অনেক কারন থাকতে পারে। তবে চুল পড়ার কমন কিছু কারণ হচ্ছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, মাত্রাতিরিক্ত টেনশন করা, পুষ্টির অভাব ইত্যাদি।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব: একজন মানুষের পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা ৩-৪ ঘণ্টা বা ৪-৫ ঘণ্টাও ঠিকমতো ঘুমায় না। এমতাবস্তায় চুল পড়ার সম্ভবনা থাকতে পারে।

মাত্রাতিরিক্ত টেনশন করা: অতিরিক্ত হারে টেনশন বা চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তা করার ফলেও চুল পড়ার সমস্যা হতে পারে।

পুষ্টির অভাব: শরীরে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টির অভাবের ফলেও মানুষের মাথার চুল পড়ার সমস্যা হয়।

সেজন্য এই আর্টিকেলে কিভাবে চুল পড়া বন্ধ করবো? বা চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া ১৫টি সহজ উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

তাই দেরী না করে চলুন মূল আলোচনা শুরু করা যাক।

চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া ১৭টি সহজ উপায় নিচে এক এক করে দেওয়া হলো:

 

১. বাদাম

 

বিভিন্ন রকম বাদাম যেমন, কাজু বাদাম, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম, ওয়ালনাট খাওয়ার ফলে আপনার চুলের গোড়া সতেজ থাকবে এবং আপনার চুল লম্বা হবে।

কারণ, এইসব বাদামে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, বিশেষ করে ’ওমেগা ৬ ফ্যাট’। এই ওমেগা ৬ ফ্যাট আমাদের শরীর নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না। যার ফলে তা খাবার থেকে গ্রহণ করতে হয়।

এই ওমেগা ৬ ফ্যাট এর অভাবে মাথার চুল পড়ে যায় এবং চুলের রং হাল্কা হয়ে যায়।

তবে অতিরিক্ত পরিমাণে বাদাম খাবেন না। কারন, অতিরিক্ত বাদাম খাওয়ার ফলে আপনার ওজন বেড়ে যেতে পারে।

 

২. হলুদ, সবজি ও ফলমূল

 

চুলের ফলিকল বা চুলের গোড়া, যেখান থেকে চুলটা বড় হয় তা ঠিকমতো কাজ করার জন্য প্রয়োজন ‘ভিটামিন – এ’।

আর এই ভিটামিন – এ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় হলুদ সবজি ও ফলমূলে।

কিছু হলুদ, সবজি ও ফলমূল এর নাম হচ্ছে:

  • গাজর,
  • আম,
  • মিষ্টি আলু,
  • পেঁপে,
  • মিষ্টি কুমড়াঁ।

 

দিনে একজন মানুষের যতখানি ভিটামিন – এ এর প্রয়োজন তার অর্ধেক আধা কাপ গাজরের মাধ্যমেই পূরণ হয়ে যায়।

সেজন্য দিনে কিছু হলুদ ফল ও সবজি খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

 

৩. তৈলাক্ত মাছ

 

আমাদের মাঝে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে ‘ওমেগা -৩ ফ্যাট’ এর জন্য স্যামন, টুনা ইত্যাদি এ জাতীয় সামুদ্রিক মাছই খেতে হবে। কিন্তু সামুদ্রিক ছাড়াও দেশী মাছ যেমন: কই, মলা, ইলিশ, চাপিলা ইত্যাদি এইসব মাছেও রয়েছে ‘ওমেগা -৩ ফ্যাট’।

এগুলো আপনার চুল ঘন ও কালো করতে সাহায্য করবে। তার সাথে এগুলো প্রোটিনেরও ভালো উৎস।

 

৪. ডিম

 

আমাদের চুল প্রায় পুরোটাই প্রোটিনের তৈরি। শর্করা বা ফ্যাটের তৈরি নয়। আর আমরা গবেষণা থেকে জানা যায় যে খাবারে প্রোটিনের অভাব হলে চুল পড়ে যায়।

আমাদের অনেকের খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন থাকে না। সেজন্য চুল পড়ার সমস্যাটাও বেশি দেখা যায়।

তাই আপনার সুন্দর চুলের জন্য খাবারের তালিকায় ডিম রাখবেন। তাছাড়া ডিমে আরও রয়েছে সেলেনিয়াম, বায়োটিন, ভিটামিন – বি১২ ইত্যাদি। এইসব আপনার চুলকে ঘন, কালো ও সুন্দর রাখতে সাহায্য করে।

 

৫. পালং শাক

 

পালং শাকে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। যথা: ভিটামিন – এ, ভিটামিন – সি, আয়রন ও ফলেট যা ঘন, কালো ও সুন্দর চুলের জন্য প্রয়োজন।

সেজন্য সুন্দর ও ঘন কালো চুলের জন্য পালং শাক প্রয়োজন।

 

৬. ডাল

 

ডালে রয়েছে প্রোটিন, আয়রন। গবেষণা থেকে জানা যায় যে আয়রনের অভাবে চুল পরে। কারণ, আয়রন আমাদের মাথার তালুতে রক্ত সরবরাহ করে চুলের গোড়ায় অক্সিজেন পৌঁছাতে সহায়তা করে।

তাছাড়া ডালে আরও রয়েছে জিঙ্ক ও ফলেট।

খুব পাতলা ডাল খাওয়ার চেয়ে ডাল ঘন করে রান্না করে খেলে এসব পুষ্টি বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।

সেজন্য সুন্দর চুলের জন্য ডাল অনেক উপকারী।

 

৭. বিভিন্ন প্রকারের বীজ

 

মিষ্টিকুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, চিয়া সিডস, তিসির বীজ ইত্যাদি এসবে রয়েছে অনেক চমৎকার উপাদান যা সুন্দর চুল পেতে সহায়তা করে।

কারণ, মিষ্টিকুমড়ার বীজে রয়েছে জিঙ্ক, সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে বায়োটিন, চিয়া সিডস এ আছে আলফা-লিনোলিনিক এসিড এক প্রকারের ওমেগা – ৩ ফ্যাট, তিসির বীজে রয়েছে সেলেনিয়াম। গবেষণায় চুল পরার সাথে এগুলোর অভাবের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।

প্রশ্ন: বীজ কিভাবে খাবেন?

উত্তর: বীজ খাওয়ার কিছু উপায় নিচে দেওয়া হলো:

  • ভাত খাওয়ার সময় তরকারির উপরে কিছু বীজ ছিটিয়ে দিতে পারেন।
  • রাতের বেলা টক দই, অল্প দুধের সাথে চিয়া সিডস মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন এবং সকাল বেলা কিছু ফলের সাথে তা খেয়ে নিতে পারেন।

 

৮. ছোলা

 

ছোলাতে তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। যথা: প্রোটিন, আয়রন ও জিঙ্ক। এই তিনটির কোনোটির অভাব পড়লে চুল পরার সমস্যা হতে পারে।

সেজন্য চুল পড়া বন্ধ করতে মাঝে মধ্যেই খাবারে ছোলা রাখতে পারেন।

 

৯. টক দই

 

টক দইয়ে রয়েছে প্রোটিন, জিঙ্ক ইত্যাদি যা সুন্দর চুলের জন্য প্রয়োজনীয়। তাছাড়া মুরগির মাংসেও প্রোটিন রয়েছে।

 

১০. টক ফল

 

মালটা, কমলা, লেবু, ‍কিউয়ি ফল ইত্যাদি এসবে অনেক পরিমানে রয়েছে ভিটামিন – সি। আর ভালো চুলের জন্য ভিটামিন – সি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

ভিটামিন – সি এর অভাবে চুল বেঁকিয়ে পেঁচিয়ে যায় যাকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় ‘corkscrew hair’ ।

তাছাড়া ভিটামিন – সি এর অভাব হলে আমাদের শরীর আয়রন শোষণ করতে পারে না। যার ফলেও চুল পরে।

শরীর নিজে থেকে ভিটামিন – সি বানাতে পারে না। তবে টক জাতীয় ফল খেলে সেখান থেকে সহজেই ভিটামিন – সি নিয়ে নিতে পারে।

যারা টক জাতীয় ফল একটু কম খেতে পারে তাদের জন্য পেয়ারা, টমেটো এইসব ভিটামিন – সি এর ভালো উৎস হতে পারে।

 

১১. কদুর তেল

 

চুল পরে যাচ্ছে এমন ধরনের রোগীদের সাথে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে এই তেলটা তিন মাস ব্যবহার করার ফলে তাদের মাথায় নতুন চুল গজিয়েছে এবং চুল আগের থেকে মোটা হয়েছে।

সেজন্য এই কদুর তেলটা ব্যবহার দেখতে পারেন আপনার চুল পড়া বন্ধ হয় কিনা।

 

১২. ভিটামিন – ডি

 

খাবার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন – ডি পাওয়া খুবই কঠিন। ভিটামিন – ডি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো রোদে সময় কাটানো।

যাদের পক্ষে রোদে সময় কাটানো সম্ভব না তারা আলাদা করে ভিটামিন – ডি ট্যাবলেট খেতে পারেন। তবে অধিক মাত্রায় ভিটামিন -ডি ট্যাবলেট খেলেও চুল পড়তে পারে। যেমন ভিটামিন – এ ট্যাবলেটও অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে চুল পরে যায়। তবে হলুদ রঙের সবজি খেয়ে শরীরে যতই ভিটামিন – এ প্রবেশ করান না কেন তা কোনো সমস্যা নেই। তাই এ বিষয়ে একটু সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

 

১৩. শ্যাম্পু ব্যবহার করার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করা

 

অনেকেই শ্যাম্পু ব্যবহার করার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করেন না যা চুলের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের চুল ভালো থাকার জন্য কিছু তেলের প্রয়োজন হয় যা আমাদের মাথার তালু থেকে এমনিতেই আসে।

যখন আপনি শ্যাম্পু ব্যবহার করেন চুল ধোয়ার জন্য তখন সেই তেলটাও কিন্তু ধুঁয়ে যায়।

তাই শ্যাম্পু ব্যবহার করার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করার কাজ হচ্ছে চুলে সেই তেলটাকে পুনরায় ফেরত দেওয়া।

 

১৪. ভেজা চুল ঘষে ঘষে মুছবেন না

 

অনেকেই ভেজা চুল ঘষে ঘষে মুছে যা করা ঠিক নয়। কারণ, ভেজা চুল ঘষে ঘষে মুছলে চুল নষ্ট হয়ে যায়।

চুল ঘষে ঘষে না মুছে তোয়ালে দিয়ে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে পানি বের করবেন।

এতে করে আপনার চুল ভালো থাকবে।

 

১৫. ভেজা চুল আছঁড়ানো যাবে না

 

অনেকেই গোসল করার পর মাথার চুল না শুকিয়েই ভেজা চুল আছঁড়ায় যা একদম করা ঠিক নয়।

কারণ, ভেজা চুল চিড়নি দিয়ে আছঁড়ালে চুল নষ্ট হয়ে যায়। চুল যদি খুব কোঁকড়া না হয় তবে চুল একটু শুকিয়ে যাবার পরে মোটা বা চওরা দাতের চিড়নি দিয়ে চুল আছঁড়াবেন।

 

১৬. ব্লো ড্রাইয়ার বা কার্লিং আয়রন দিয়ে চুল শুকাবেন না

 

ব্লো ড্রাইয়ার বা কার্লিং আয়রন দিয়ে চুল শুকানোর চেয়ে বাতাসে চুল শুকানো সবচেয়ে বেশি ভালো।

তবে  যদি ব্লো ড্রাইয়ার বা কার্লিং আয়রন দিয়ে চুল শুকাতেই হয় তবে তা খুব কম হিটে অল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করবেন। চেষ্টা করবেন সপ্তাহে একবারের বেশি ব্যবহার না করার।

 

১৭. খুব টাইট করে চুল বাঁধবেন না

 

খুব টাইট করে চুল বেঁধে রাখবেন না। খুব টাইট করে চুল বেঁধে রাখার কারণে চুলে টান পরে আর চুলে এই টান পরার কারনে চুল পড়তে পারে। এটিকে বলা হয় ট্র্যাকশন এলোপেশিয়া।

তাই এ বিষয়ে খেয়াল রাখবেন।

 

আরও পড়ুন:

 

চুল পড়া বন্ধ করার চিকিৎসা কি?

 

কিছু কিছু রোগের কারণেও চুল পড়তে পারে। যেমন: রক্তশূণ্যতা, থাইরয়েডের রোগ। যদি আপনার খাবার-দাবার ঠিক থাকার পরেও চুল অনেক পরিমাণে পরতে থাকে তবে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।

তিনি খতিয়ে দেখবেন যে কোন রোগের কারণে আপনার মাথার চুল পরছে কিনা এবং যদি রোগ ধরা পরে তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে চুল পড়া বন্ধ করতে পারবেন।

Androgenetic Alopecia নামের রোগটিও চুল পড়তে থাকার অন্যতম একটি কারন।

এই রোগের কারণে ছেলেদের মাথায় টাক পড়তে শুরু করে, কপালের দু পাশ থেকে চুল টাক হতে পারে। মেয়েদের সাধারণত টাক না হলেও চুল পাতলা হয়ে যায়, সিঁথি বড় হয়ে যায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন যে আপনার এই রোগটি হয়েছে কিনা এবং কোন ঔষুধে ভালো হবে।

ঔষুধ ছাড়াও আরও উন্নত চিকিৎসা রয়েছে। যেমন: হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট (Hair Transplant) অর্থাৎ, মাথার পিছন থেকে চুল তুলে এনে সামনের দিকে বসানো।

তাছাড়া পিআরপি থেরাপিতেও কেউ কেউ ভালো ফল পাচ্ছেন।

তবে সবচেয়ে ভালো হয় আপনি একজন ডারমাটোলোজিস্ট বা স্কিনের ডাক্তারের কাছে গেলে তারা আপনার চুল পড়া বন্ধ করার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারবে।

 

পরিশেষে, এই আর্টিকেলে আমি কিভাবে চুল পড়া বন্ধ করবেন? বা চুল পড়া বন্ধ করার ১৭টি সহজ উপায় ও চুল পড়া বন্ধ করার চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আর্টিকেলটি উপরে চুল পড়া বন্ধ করার উপায় নাম্বার ১ থেকে উপায় ১০ পর্যন্ত যে খাবার গুলোর নাম ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বলেছি তা আপনার চুল পড়া বন্ধ করতে ভিতর থেকে সহায়তা করবে। এবং চুল পড়া বন্ধ করার উপায় ১১ থেকে ১৭ নাম্বার উপায় পর্যন্ত যেসব বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে তা আপনার চুল পড়া বন্ধ করতে বাহিরের দিক থেকে সহায়তা করবে।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment