কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত

Join Telegram Channel

ভূমিকা: আমাদরকে মুসলমান হিসেবে ইসলামের ঐতিহাসিক এবং বিশেষ দিন গুলির ইতিহাস সম্পর্কে জানা থাকা আমাদের সকল মুসলমানের জন্য দায়িত্ব। সেই হিসেবে জ্বীলহজ্জ মাস আমাদের মুসলমানদের জন্য বিশেষ এক শিক্ষা অর্জনের মাস।

জ্বীলহজ্জ মাস হলো সেই মাস যে মাসে উম্মতে মুসলিমার জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম আ: ঐতিহাসিক পিতা পুত্রের আল্লাহ তাআলার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন।

সেই অনুপাতে আমাদের সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব হলো হযরত ইব্রাহীম আ: সেই ঐতিহাসিক আল্লাহ প্রদত্ত পরিক্ষায় সফলতা অর্জন করাকে স্বরণ করে এবং সেটাকে আমাদের নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরী।

 

কুরবানীর ইতিহাস

 

কুরবানীর অর্থ হচ্ছে আল্লহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা। প্রথমত, এই কুরবানীর ইতিহাস আমরা জানতে পারি আদি পিতা হযরত আদম আ: এর পুত্রদয় হাবিল ও কাবিল তারা তাদের বোন আকলিমাকে বিয়ের বিষয় নিয়ে পরষ্পরে বিবাদে জড়িত হয়। যার কারণে তাদের পিতা (হযরত আদম আ:) তাদেরকে বলেন যে তোমরা আল্লহর জন্য তোমাদের সম্পদে কোন এক অংশ কুরবানী করো।

তৎকালীন সময়ে কুরবানীর পদ্ধতি ছিলো যে কুরবানী দাতা গণ তাদের কুরবানী বস্তুকে বিশেষ কোনো স্থানে রাখতেন।

অতঃপর যার কুরবানীর বস্তুকে আল্লহ তাআলার পছন্দ হতো সেটাকে আসমান থেকে কুদরতী আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিতেন। সেই হিসেবে হযরত আদম আ: তাঁর সন্তানদ্বয়কে আদেশ করেন  যে তোমরা তোমাদের যে বিষয় নিয়ে পরষ্পরে বিবাদে জড়িয়েছো সেটা নিরসনের জন্য একমাত্র উপায় হলো তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুকে আল্লহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করো।

কুরবানী করার  পদ্ধতিটা হবে এমন যে তোমরা উভয়ে তোমাদের কুরবানীর বস্তুকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় রাখবে।

অতঃপর যার বস্তুকে আল্লহ তাআলার কুদরতী আগুন এসে জ্বালিয়ে দিবে বুঝতে হবে তার কুরবানী আল্লাহ কবুল করেছেন। এবং সেই আকলিমা কে বিবাহ করবে। এবং এটিই হচ্ছে আল্লহর ফয়সালা।

তাদের এ বিষয়ে কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “যখন তারা দুই ভাই কুরবানী করলেন, সুতরাং আল্লাহ তা’আলা উভয়ের মধ্য থেকে একজনের কুরবানীকে কুবল করলেন এবং অপরজেন কুরবানীকে প্রত্যাখান করলেন। যার কুরবানীকে প্রত্যাখান করা হলো সে বললো অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করবো। যাকে হত্যা করতে চাইলো সে জবাবে বললো যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তার মুত্তাকিন বান্দাদের কবুল করেন।”

এই ছিলো পূর্ব ইতিহাস।

 

ইব্রাহিম আঃ এর কোরবানির ইতিহাস

 

আল্লাহ পাক যুগে যুগে অনেক নবী-রাসুল দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। এবং সকল নবীকেই আল্লাহ পাক বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করেন। নবীগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হোন হযরত ইব্রাহীম আ: এবং প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি পরিপূর্ণ সফলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হোন।

তারমধ্যে তার নবুয়তের প্রথম দিকে অগ্নিকুণ্ড নিক্ষেপ হওয়ার ঘটনা আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা রয়েছে। এর চেয়েও বড় পরীক্ষা ছিলো আল্লহর আদেশের আনুগত্য করতে গিয়ে নিজ হাতে নিজের একমাত্র আদরের সন্তান হযরত ইসমাইল আ: কে কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

যেই সন্তানকে হযরত ইব্রাহীম আ: পেয়েছিলেন যখন তাঁর বয়স হয়েছিল নিরানব্বিই (৯৯) বছর ও তাঁর স্ত্রীর বয়স হয়েছিল আশি (৮০) বছর।

 

যে কারণে হযরত ইব্রাহীম আ: নিজ সন্তানকে কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নেয়

 

৭ই জ্বীলহজ্জ হযরত ইব্রাহীম আ: স্বপ্নে দেখেন যে তাকে তাঁর প্রিয় বস্তুকে কুরবানী করার আদেশ করা হয়।

অতঃপর তিনি ৮ই জ্বীলহজ্জ তার নিজ সম্পদ হতে ৭০টি উট কুরবানী করেন। কিন্তু সেদিন রাতেও তিনি আবার সেই একই স্বপ্ন দেখেন।

পরের দিন আবারও তিনি তাঁর নিজ সম্পদ হতে পুনরায় ৭০টি উট কুরবানী করেন। কিন্তু সেদিন রাতেও তিনি সেই পূর্বের স্বপ্নই আবার দেখেন। তখন হযরত ইব্রাহীম আ: বুঝতে পারলেন যে তিনি যা কুরবানী করতেছেন তা আল্লাহ তা’আলা চাচ্ছেন না।

আর নবীদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী’র মতোন। সে হিসেবে তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম আ: এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হচ্ছে তার একমাত্র আদরের সন্তান হযরত ইসমাইল আ:।

সেজন্য তিনি তারপরের দিন তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল আ: কে ডেকে বললেন, “قال الله تعالى بسم الله الرحمن الرحيم قال يا بني اني ارى في المنام اني اذبحك فانظر ماذا ترى قال يا ابت افعل ما تؤمر ستجدني ان شاء الله من الصابرين فلما اسلمأ وطله للجبين وناديناه ايا ابراهيم  قد صدقت الرؤيا انا كذلك نجس المحسنين“

উপরে উল্লিখিত আয়তটির বাংলা অর্থ হচ্ছে, “আল্লহ তা’আলা বলেন, হযরত ইব্রাহীম আ: তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল আ: কে ডেকে বললেন, হে প্রিয় বৎস আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে জবেহ করছি এ বিষয়ে তোমার সিদ্ধান্ত কি? হযরত ইসমাইল আ: বললেন, হে আমার প্রিয় বাবা আপনি সেটাই করুন যেটার ব্যাপারে আপনাকে আদেশ করা হয়েছে। অতি সত্তর আপনি আমাকে পাবেন। যদি আল্লাহ তা’আলা চান ধৈর্য কারীদের অর্ন্তভুক্ত হিসেবে। সুতরাং, তারা পিতা ও পুত্র উভয়ে আল্লহর আনুগত্য পরিপূর্ণ ভাবে পালন করলেন। এবং আল্লাহ পাক ডেকে বললেন হে ইব্রাহীম তুমি তোমার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছো। আমি এভাবেই অনুগ্রহ কারীদের প্রতি দয়া করে থাকি।”

উক্ত আয়াতটির ব্যাখ্যা হচ্ছে, হযরত ইব্রাহীম আ: স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাঁর পুত্র ইসমাইল আ: কে কুরবান করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ী থেকে বের হোন। ইতোমধ্যে ইবলিশ সয়তান এসে হযরত হাজেরা আ: (হযরত ইব্রাহীম আ: এর স্ত্রী) কে বলেন তোমার স্বামী তো তোমার ছেলেকে জবেহ করে ফেলবে।তুমি তাকে বাধা দেওনা কেন?

তখন হযরত হাজেরা আ: বললেন, “যে কাজে আল্লাহ তা’আলা সন্তুষ্ট থাকেন সে ব্যাপারে আমার বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।” আর নিশ্চয়ই তুমি ইবলিশ সয়তান। তারপর ইবলিশ সয়তান পথিমধ্যে গিয়ে হযরত ইসমাইল আ: কে ধোঁকা দিলেন।

বললেন যে, তোমাকে তোমার বাবা রশি এবং ছুড়ি নিয়ে জবেহ করতে যাচ্ছে। তুমি কি এ ব্যাপারে অবগত নও?

তখন হযরত ইসমাইল আ: বললেন যে ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা রাজী এবং সন্তুষ্টু রয়েছেন সে বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই।

শেষে কোনো উপায় না পেয়ে ইবলিশ সয়তান হযরত ইব্রাহীম আ: ধোঁকা দিতে গেলেন। এবং তাঁকে বললেন যে, আপনি এটা কি করতে যাচ্ছেন। নিজের একমাত্র আদরের পুত্রকে নিজ হাতে জবেহ করতে যাচ্ছেন।

যেমনটি কাবিল তার আপন ভাই হাবিল কে হত্যা করেছেন। তখন ইব্রাহীম আ: উত্তরে বললেন, নিশ্চই তুমি আল্লাহ তা’আলার প্রতারিত ইবলিশ সয়তান। আরে কাবিল তো তার ভাই হাবিল কে শত্রুতার বশবর্তী হয়ে হত্যা করেছিলেন। আর আমিতো আল্লহ তা’আলার হুকুমকে বাস্তবায়িত করতে নিজ সন্তানকে কুরবানী করতে নিয়ে যাচ্ছি।

এরপর ইব্রাহীম আ: ৭টি কঙ্কর হাতে নিলেন এবং ইবলিশ সয়তানের দিকে নিক্ষেপ করলেন। এই স্থানকে বলা হয় ’জামারায় উলা’। কিছু দূর যেতে না যেতেই ইবলিশ সয়তান আবারও একই ভাবে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবং ইব্রাহীম আ: পূর্বের ন্যায় আবারও ৭টি কঙ্কর হাতে নিয়ে তার দিকে নিক্ষেপ করলেন।

এই স্থানকে বলা হয় ‘জামরায়ে উস্ তা’। আবারও কিছু পথ যাওয়ার পরে ইবলিশ সয়তান একই ভাবে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পূর্বের ন্যায় ইব্রাহীম আ: ইবলিশ সয়তানের দিকে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এবং এই স্থানটির নাম বলা হয় ‘জামারায়ে আকাবায়’।

সেই তখন থেকই এই যায়গা তিনটি স্বরণীয় হয়ে রয়েছে প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে। শুধু তাই নয় এই তিনটি স্থানকে পবিত্র হজের মধ্যে অন্যান্য আমলের সাথে পালন করা হয়।

এরপরে হযরত ইব্রাহীম আ: তার পুত্র ইসমাইল আ: কে নিয়ে মিনার ময়দানে পৌছান। এবং জবেহ করার পূর্বে হযরত ইসমাইল আ: তাঁর পিতাকে ৪টি কথা বলেন। যথা:

১. আমাকে জবেহ করার পূর্বে আপনার ছুড়িটিকে ভালোভাবে ধারালো করে নিন। যাতে করে অতি দ্রুত আল্লহর হুকুমকে পালন করতে পারেন।

২. জবেহ করার সময় আমার ইচ্ছে হলো আমাকে চিত করে না শুইয়ে উপুর করে শোয়াবেন। যাতে করে কুরবানী করার সময় আমি সিজদা অবস্থায় থাকতে পারি।

৩. আমাকে কুরবানী করার সময় আপনার কাপড় গুলো ভালো ভাবে গুটিয়ে নিবেন। যাতে করে আমার রক্তের ছিটেফোঁটা আপনার কাপড়ে না লাগে। কেননা এটা দেখলে আমার মা আরও বেশি কষ্ট পাবেন।

৪. এবং জবেহ করার পর আমার কাপড় গুলোকে আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিবেন।

একমাত্র ছেলের মুখে এসব কথা শুনার পর হযরত ইব্রাহীম আ: অঝোরে কান্না করেন। এবং ছেলেকে জবেহ করার জন্য অগ্রসর হোন ও ছেলের গলায় ছুড়ি বসান। ইতোমধ্যে আল্লাহ তা’আলা হযরত জীবরাইল আ: বলেন যে তুমি তারাতারি যাও এবং জবেহ করা বন্ধ করো। যেন ইসমাইল আ: এর একটি পশমও না কাটে।

এবং ইসমাইল আ: এর স্থানে একটি জান্নাতি দুম্বা নিয়ে দেও। তারপর হযরত জীবরাইল আ: আসমান থেকে সুবাহানআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাহু আল্লাহু আকবার, তাকবীর ধ্বনী দিয়ে দুম্বা এনে দেন এবং হযরত ইসমাইল আ: এর যায়গায় দুম্বা কুরবানী হয়ে যায়।

 

কুরবানীর ফজিলত

 

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, ”قال اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم يا رسول الله ما هذه الاضاحي قال سنه ابيكم ابراهيم عليه السلام قالوا فما لنا فيها يا رسول الله قال بكل شعره حسنه الى اخر الحدي “

হাদীসের অনুবাদ হচ্ছে, “সাহাবায়ে কেরাম জিঞ্জাসা করলেন ইয়া রাসুল আল্লাহ কুরবানী কী? জবাবে রাসুল (সা:) বললেন, কুরবানী হলো তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম আ: এর সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন এর মধ্যে আমাদের কী উপকার? আল্লার রাসুল বললেন যে, তোমাদের উপকার হচ্ছে ’প্রতেকটি পশমের বিনিময়ের একটি নেকী দান করবেন। তারপর সাহাবায়ে কেরাম আবার আরজ করেন যে দুম্বার ব্যাপারেও কি একই সওয়াব দান করা হবে? আল্লার রাসুল জবাবে বললেন, হুম দুম্বার ব্যাপারেও একই পরিমাণ সওয়াব দান করা হবে।”

 

আরও পড়ুন:

 

পরিশেষে, আমাদের সকল সামর্থ্যবান, বিবেকবান এবং প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ঐ সকল মুসলমান নর-নারীর উপর কুরবানী করা ওয়াজিব যাদের কাছে ১০ই জ্বিলহজ্জ ফজরের পর থেকে ১২ই জ্বিলহজ্জ মাগরিবের আগ পর্যন্ত সাড়ে সাত তলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্নো তলা রুপার সম পরিমাণ মূল্য অর্থ বা সম্পদ থাকে তাদের উপরেই কুরবানী করা ওয়াজীব।

কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত

 

আলোচক: হাফেজ মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম।                                      লেখক: ওসমান আলী

Facebook: Md Jahangir Alom

Spread the love
Join Telegram Channel

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

6 thoughts on “কুরবানীর ইতিহাস ও ফজিলত”

Leave a Comment