খেজুর রস অতি সুস্বাদু একটি পানীয়। যা কেবল শীত কাল আসলেই পাওয়া যায়। তাই অনেকেই কৌতুহল বা আগ্রহবসত জানতে চান যে খেজুর রস কেবল শীত কালে কেন পাওয়া যায়? গ্রীষ্মকালে কেন খেজুর পাওয়া যায় না?
এইসব প্রশ্নের জবাব নিয়েই এই আর্টিকেলটি সাজানো হয়েছে। তাই আর দেরী না করে চলুন মূল আলোচনা শুরু করা যাক।
খেজুর রস কেবল শীত কালে পাওয়া যায় কেন?
খেজুর রসের মতোন এত সুস্বাদু একটি পানীয় শুধু শীত কালেই কেন পাওয়া যায়? গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে কেন এই সুস্বাদু খেজুর পাওয়া যায় না?
এর পেছনে রয়েছে অসাধারণ একটি বৈজ্ঞানিক কারণ যা জানলে আপনি অবাক হবেন।
শীতকালে খেজুর গাছে রস হওয়ার প্রাকৃতিক রহস্য:
- অন্যান্য গাছের মতোই খেজুর গাছও তার মূলের মাধ্যমে জমি থেকে পানি শোষণ করে থাকে।
- মূলের মাধ্যমে শোষণ করা এই পানি যখন খেজুর গাছের পাতায় পৌঁছায় তখন সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে সেখানে এক ধরনের ‘গ্লুকজ’ বা খাবার তৈরি হয়।
- খেজুর গাছের পাতা থেকে তৈরী হওয়া এই গ্লুকজই পরে চিনিতে রুপান্তরিত হয়। যা গাছের বৃদ্ধি ও পরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
- খেজুর গাছ নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে যখন দেখে যে অতিরিক্ত চিনি রয়ে গেছে তখন সেটিকে স্টাচ নামক এক ধরনের শর্করার মাধ্যমে নিজের শরীরে জমিয়ে রাখে। এটি অনেকটা মানুষের শরীরে চর্বির মতোন। যা বিপদ বা আপদকালীন সময়ে কাজে লাগে।
- শীত কালে মাটিতে পানির পরিমাণ অনেক কমে যায়। পানির অভাবে গাছের পাতায় খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়াও অকেটা ধীর হয়ে যায়।
- ঠিক এই সময়টাতেই প্রকৃতি দেখায় তার জাদুকরী খেলা। খেজুর গাছ যখন বুঝতে পারে যে তার চারপাশের তাপমাত্রা কমে আসতেছে। তখন খেজুর গাছের কোষ থেকে এক বিশেষ ধরনের এনজাইম ক্ষরণ হতে শুরু করে।
- এই বিশেষ ধরনের এনজাইম কাজ হচ্ছে জমা রাখা কঠিন স্টার্চ কে ভেঙ্গে আবার তরল চিনিতে পরিণত করা।
- যেহেতু মাটি থেকে শোষণ করা পানি গাছের কাণ্ড বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে ধাবিত হতে থাকে তাই এই পানির সাথে চিনি মিশে গিয়ে তৈরি এক সুস্বাদু শরবত বা পানীয়। যাকে বলা হয় ’খেজুরের রস’।
- গাছের মূল থেকে উঠা এই রস সবসময় গাছের উপরের দিকে যেতে চায়। তাই যখন কেউ শীতকালে খেজুর গাছে উঠে গাছের মাথায় একটু ছেচে একটি ক্ষত তৈরি করেন তখন উপরের দিকে উঠতে থাকা সে রস সেই ক্ষত স্থান দিয়ে চুইয়ে বের হতে থাকে।
- আর শীতের তীব্রতা যত বাড়ে এনজাইমের প্রভাবে স্টার্চ ভেঙ্গে রস তত বেশি মিষ্টি ও গাঢ় হয়।
গ্রীষ্মকালে কেন খেজুর রস পাওয়া যায় না?
গ্রীষ্মকালে কেন খেজুর রস পাওয়া যায় না এ বিষয়ে নিচে জানানো হলো:
গ্রীষ্মকালে চারপাশের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় সেই বিশেষ ধরনের এনজাইমি কাজ করে না। এবং গাছের খাদ্য তৈরির যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে সেটি চালু থাকে।
সেজন্য গ্রীষ্মকালে খেজুর গাছের রস পাওয়ার কোনো সম্ভবনা থাকে না।
প্রকৃতির এই যে এক অদ্ভুত রসায়ন এটিই শীতকালকে করে তুলেছে মধুময়।

খেজুর গাছ সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
নিচে খেজুর গাছ সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো:
খেজুর গাছ কত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে?
উত্তর: একটি খেজুর গাছ সাধারণত ৫-৬ বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে ৪ বছরেও রস দেওয়া শুরু করে।
খেজুরের রস কখন পাওয়া যায়?
উত্তর: প্রতি বছর বাংলা আশ্বিন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত খেজুর রস পাওয়া যায়। ইংরেজি অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত খেজুরের রস পাওয়া যায়।
খেজুরের রস এর ইংরেজী কী?
উত্তর: খেজুরের রস এর ইংরেজী হচ্ছে ‘Date Juice’।
শীত কালে কেন খেজুর রস মিষ্টি লাগে?
উত্তর: শীত কালে চারপাশের তাপমাত্রা কমে গেলে খেজুর গাছে এক ধরনের বিশেষ এনজাইমের ক্ষরণ হতে শুরু করে। এই বিশেষ ধরনের এনজাইম তখন খেজুর গাছে জমা রাখা কঠিন স্টার্চ কে ভেঙ্গে তরল চিনিতে পরিণত করে। গাছের মূল থেকে উঠে আসা পানির সাথে এই তরল চিনি মিশ্রিত হয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু এক পানীয় বা শরবত।
এ কারণেই শীতকালে খেজুর রস মিষ্টি লাগে। শীতের তীব্রতা যত বাড়তে থাকতে খেজুর রস তত গাঢ় ও মিষ্টি বেশি লাগে।
খেজুর গাছের মাথার দিকের অংশ থেকে রস নির্গত হয় তাকে কী বলা হয়?
উত্তর: খেজুর গাছের মাথার দিকে যে অংশে খেজুর রস সংগ্রহ করার জন্য কাটা হয় বা ছেচা হয় তাকে ’কপালি’ বলে (তবে অঞ্চলভেদে এই নামের ভিন্নতা থাকতে পারে)। এবং খেজুর গাছে রস সংগ্রের জন্য বাঁধা কলসিতে ফোঁটায় ফোঁটায় যেটার মাধ্যমে রস পড়ে সেটিকে বলা হয় ‘গোজা নল’।
খেজুর রস থেকে কী কী তৈরি হয়?
উত্তর: খেজুরের রস থেকে অনেক কিছু তৈরি করা হয় বা যায়। যেমন: খেজুর রস দিয়ে খেজুরের গুড়, গুড়ের জিলাপি, তৈরি করা হয়। তাছাড়া খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে পায়েস রান্না করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন পিঠাও তৈরি করা হয়।
খেজুর গাছের ইংরেজি নাম কী?
উত্তর: খেজুর গাছের ইংরেজি নাম হচ্ছে ‘Date Palm’।
খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক নাম কী?
উত্তর: খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ‘Phoenix dactylifera’।
একটি খেজুর গাছ কত লিটার খেজুর রস উৎপাদন করতে পারে?
উত্তর: একটি পূর্ণ বয়স্ক খেজুর গাছ প্রতি বছর শীত কালে বা শীত মৌসুমে মোট ১৫০-১৬০ লিটার খেজুর রস উৎপাদন করতে পারে।
আরও পড়ুন:
- এনজিও কী? | এনজিও কাকে বলে?
- সুতা কী? | সুতা কত প্রকার ও কি কি?
- দারাজে পণ্য রিটার্ন দিয়ে টাকা রিফান্ড নেওয়ার নিয়ম
পরিশেষে, আশাকরি এই ‘খেজুর রস কেবল শীত কালে পাওয়া যায় কেন? | গ্রীষ্মকালে কেন খেজুর রস পাওয়া যায় না?’ আর্টিকেলে আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জেনে একটু হলেও উপকৃত হয়েছেন বা ভালো লেগেছে।



