আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর ধ্যানের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ অনুভূতি বা মনোভাবই হচ্ছে সুফিবাদ। মুতাযিলা সম্প্রদায়ের উগ্র বুুদ্ধিবাদ আর রক্ষণশীলদের অন্ধ আনুষ্ঠানিকতার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ মতবাদের পথচলা শুরু হয়।
এই সাধনা করা হয় পরমাত্মার দিদার লাভের উদ্দেশ্যে, মূলত এটি হচ্ছে একটি ধর্মীয় উৎসব।
সুফিবাদের সংজ্ঞা দাও
সুফিবাদের সংজ্ঞা: ‘সুফি’ শব্দটি একটি আরবি শব্দ যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘দরবেশ’। সত্যিকারের সুফিদের ধর্ম সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান আছে এবং তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হয়।
সুফিবাদ হচ্ছে এমন একটি আধ্যাত্মিক মরমিবাদ যাতে বাহ্যিক শুদ্ধতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি অর্জনের জন্য পাশবিক কামনা-বাসনা ও লালসায় নির্মূলার্থে অনাড়ম্বর ও নির্লোভ জীবনাচারের বিষয়ে সর্বশেষ গুরুত্বারোপ করা।
সুতরাং, এটা বলা যায় যে, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ইসলামে যে মরমি ভাবধারার উৎপত্তি হয় তাই হচ্ছে মরমিবাদ।
সুফিবাদ সম্পর্কে উক্তি দাও
নিচে সুফিবাদ সম্পর্কে কতি পয় উক্তি দেওয়া হলো:
- আবু আলী ফিজালীর মতে, “সুফিবাদ মনোরম আচরণ ছাড়া অন্য কিছু নয়।”
- আল কুশাইরীর মতে, “বাহ্য ও অন্তর জীবনের বিশুদ্ধই সুফিবাদ।”
- জাকারিয়া আনসারীর মতে, “সুফিবাদ মানুষের আত্মার বিশুদ্ধতার শিক্ষা দেয়।”
- কারো কারো মতে, ‘সুফিবাদ হচ্ছে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন।”
সুফিবাদের মূলনীতিসমূহ কি কি?
সুফিবাদের মূলনীতি: আত্মশুদ্ধি , আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়ত হওয়া ও সাফল্য লাভের জন্য একজন সুফি-সাধককে কতগুলো নীতি বা পদ্ধতির অনুসরণ করতে হয়। সুফিবাদে এই নীতি বা পদ্ধতিগুলোকেই মূলত সুফিবাদের মূলনীত বলা হয়।
নিচে সুফিবাদের মূলনীতিসমূহ তুলে ধরা হলো:
- আত্মসমর্পণ: আল্লাহতে পরিপূণৃ আত্মসমর্পণ করা সুফিবাদের মূলনীতির মধ্যে অন্যতম। মুসলমান ঈমানদারদের ‘ইহকাল ও পরকাল’ সবকিছুই আল্লাহর জন্য সম্পর্কিত। সুফিরা এ শাশ্বত জীবনের অনুসরণেই আত্মসমর্পণের বিশেষ নীতি মেনে চলেন। (আত্মসমপর্ণের পদ্ধতি: সুফির পীর-মুর্শিদ, রাসুল (স.)-নুর-ই-তাজাল্লী)।
- জিকির: আল্লাহকে স্মরণ করার নামই জিকির। সাধারণভাবে বলা যায় যে, আল্লাহর কোনো নাম বা কুরআনের কোনো আয়াত পুনঃপুন আবৃত্তি করার নামই জিকির। জিকির মূলত দুই প্রকার। যথা: ১. জিকিরে জলি বা উচ্চঃস্বরের জিকির ও ২. জিকিরে খফি বা নীরবে জিকির।
- কাশফ: অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে সাধক আল্লাহকে জানতে পারেন। কাশফ এমন এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি যার মাধ্যমে সাধক ভূত-ভবিষ্যত, জগতের দৃশ্যনীয় অদৃশ্যনীয় আত্মা প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারে।
- তওবা: পাপ পরিবর্জন করা ও পাপ পথে অগ্রসর না হওয়ার প্রতিজ্ঞাকে তওয়া বলে। ঔদাসীন্যের মোহনিদ্রা থেকে আত্মার জাগরণ এর তওবার প্রতক্রিয়া। তাই, শুধু ত্যাগ নয় বরং জগতের সমুদয় বস্তু থেকে খোদার দিকে প্রত্যাবর্তনই হলো তওবা।
- হাল: এক বিশেষ ভাবানুভূতি বা আধ্যাত্মিক ও মানসিক অবস্থাকে হাল বলে। কাশফের দূরবর্তী অবস্থা হলো হাল। হাল সুফি মনের এমন এক ভিত্তি যার উপর সুফির অন্তর্দৃষ্টি গড়ে ওঠে।
- তাওয়াক্কুল: সকল অবস্থায় আল্লাহর উপর নির্ভর করাই তাওয়াক্কুল। আল্লাহর ধ্যানে নিমজ্জিত থেকে সুফি অনেক সময় জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন মিটানোর জন্যও কোনো চেষ্টা করে না।
- শোকর: সুখ বা দুঃখ সকল অবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং বিপুল নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হলো শোকর। সুফি তার সমগ্র জীবন সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
- খোদা প্রেম (ঈশকে খোদা): প্রেমের মাধ্যমে সুফি তার নিজ সত্তাকে আল্লাহর সত্তআর সাথে একীভূত করতে সমর্থ হন।
- ফানা ও বাকা: সুফি সাধনার চূড়ান্ত রূপ বাকা। ফানা ও বাকা সুফি সাধনার সর্বোচ্চ রূপ বা স্তর, ‘ফানা’ অর্থ আত্মা বিনাশ। এ স্তরে সুফি তন্ময়তার মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত চেতনা মুছে দিতে বাকাবিল্লাহ বা ঐশী গুণে গুণান্বিত হন এবং তার সমুদয় ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছায় পরিণত হয়।
আরও পড়ুন:
- নগরীয়তা কাকে বলে?
- মহাকাব্য কাকে বলে? মহাকাব্য হিসেবে মেঘনাদবধ কাব্যের সার্থকতা আলোচনা কর
- শহরায়ন বা নগরায়ন কাকে বলে?
- শহরায়ন ও নগরীয়তার মধ্যে সম্পর্ক গুলো লিখ
- ছয় দফা কর্মসূচী আসলে কি? ছয় দফা কর্মসূচীর দফা ছয়টি কি কি?
- অতি শহরায়ন কাকে বলে?
উপরিউক্ত আলোচনা শেষে একথা বলা যায় যে, সুফি দর্শনের মূলনীতিগুলো ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিকেরই সমন্বিত রূপ। তাই মানুষকে সাহায্য ও ‘অন্তার’ উভয় দিকে শান্তি পেতে হলে বাস্তব জীবনে সুফিবাদের এ মূলনীতিগুলো অনুশীলন করতে হবে।



