ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায়

আমি প্রায় ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ব্লগিং সেক্টরে কাজ করে যাচ্ছি। সেই কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই এই আর্টিকেলে আমি আপনাদের সাথে ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায় সেয়ার করব।

সঠিক গাইড লাইনের অভাবে অনেকেই ব্লগিং সেক্টরে এসে বেশিদিন টিকতে পারে না। যখন কিছুদিন কাজ করার পর আশানরূপ ফলাফল পায় না তখন তারা ব্লগিং বাদ দিয়ে দেয়।

আশাকরি এই আর্টিকেলে দেওয়া ব্লগিং এ সফল হওয়ার উপায় গুলো জানার পর আপনি যদি সেগুলো সঠিক ভাবে পালন করতে পারেন তাহলে আপনিও একজন সফল ব্লগার হবে।

তাই চলুন দেরী না করে মূল আলোচনা শুরু করা যাক।

ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায়:

 

১: নিশ সিলেকশন (Niche selection)

 

ব্লগিং শুরু করার প্রথম ধাপ হচ্ছে নিশ সিলেকশন করা। নিশ হচ্ছে একটি ওয়েবসাইটের টপিক। অর্থাৎ সে বিষয় নিয়ে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হবে সেই বিষয়টি হচ্ছে সেই ওয়েবসাইটের নিশ।

যেমন: একটি মোবাইল রিভিউ (Mobile review) ওয়েবসাইটের মূল বিষয় বস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মোবাইলের রিভিউ দেওয়া। অর্থাৎ সেই ওয়েবসাইটটির নিশ হচ্ছে ‘মোবাইল’।

ঠিক একই ভাবে, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোন ওয়েবসাইটের নিশ হচ্ছে ‘স্বাস্থ্য বা হেলথ (Health), প্রযুক্তি সম্পর্কিত ওয়েবসাইটের নিশ হচ্ছে ‘টেকনোলজি (Technology)’ ইত্যাদি।

ব্লগিং শুরু করার পূর্বে আপনাকে রিসার্চ  বা যাচাই বাছাই করে আপনার ওয়েবসাইটের জন্য নিশ সিলেক্ট করতে হবে।

কারণ, বর্তমান একই বিষয়ে অসংখ্য ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং সেগুলো ভালো পজিশনে গুলো রেংকও করতেছে। এখন আপনি যদি সেই একই বিষয়ে নতুন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন তাহলে আপনার রেংক করা অনেক কঠিন হয়ে পরবে। তাই আপনাকে এমন নিশ খুঁজে বের করতে হবে যেসব নিশে এখনো তেমন ওয়েবসাইট তৈরি হয়নি। তবেই আপনি দ্রুত ব্লগিং এ সফল হতে পারবেন।

[বোনাস টিপস] দ্রুত গুগলে রেংক পাওয়ার জন্য আপনি মাইক্রো নিশ (Micro niche) নিয়ে ব্লগিং শুরু করতে পারেন। একটি নিশকে ভাঙলে যা পাওয়া যায় তাই হচ্ছে মাইক্রো নিশ। যেমন: ‘মোবাইল’ হচ্ছে একটি নিশ। এখন এটিকে ভাঙলে, ‘মোবাইল রিভিউ’, ‘মোবাইল ব্যবহারের বিভিন্ন টিপস এন্ড ট্রিক্স’, ‘মোবাইল দিয়ে ফটোশপের কাজ করা’ ইত্যাদি হচ্ছে মাইক্রো নিশ। আপনি এগুলোর যেগুলো একটি বিষয়ে সিলেক্ট করে যদি ওয়েবসাইট তৈরি করেন তাহলে সেটি হচ্ছে মাইক্রো নিশ ওয়েবসাইট।

 

২: রেসপন্সিভ ওয়েব সাইট (Responsive website)

 

অনেকেই এই বিষয়টিকে এড়িয়ে যায় যে তার ওয়েবসাইটটি রেসপন্সিভ কিনা। রেসপন্সিভ ওয়েবসাইট বলতে যা বুঝায় তা হচ্ছে, একটি ওয়েবসাইটে যখন কেউ মোবাইল থেকে ভিসিট করবে তাকে তখন ওয়েবসাইটটি মোবাইলের স্ক্রিনের সাইজের আকার ধারণ করবে, যখন কেউ ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ থেকে ভিসিট করবে তখন তাদের সামনে সেই ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের স্ক্রিন সাইজের আকার ধারণ করবে।

এতে করে একজন ভিজিটর যেই ডিভাইস দিয়েই আপনার ওয়েবসাইটে ভিসিট করুক না কেন সে কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এবং আপনার ওয়েবসাইটের আর্টিকেল গুলো পড়ে আরাম পাবে। এতে করে একজন ভিসিটর অধিক সময় আপনার ওয়েবসাইটে ব্যয় করবে।

তাই আপনার ওয়েবসাইটে সব সময় চেষ্টা করবেন একটি রেসপন্সিভ থিম বা টেমপ্লেট (Responsive theme/template) ব্যবহার করার।

 

৩: আর্টিকেল লিখার জন্য ভালো কিওয়ার্ড (Keyword) খুঁজে বের করা

 

আপনি চাইলেই যে কোন বিষয় নিয়ে আর্টিকেল লিখতে পারবেন যেহেতু ওয়েবসাইটটি আপনার। তবে এধরনের আর্টিকেল ভিজিটরদের পছন্দ হবে কিনা সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান।

কিওয়ার্ড হচ্ছে একটি আর্টিকেলের টপিক বা বিষয়বস্তু। অর্থাৎ আপনি যে বিষয় নিয়ে একটি আর্টিকেলে আলোচনা করবেন সেটি হচ্ছে সেই আর্টিকেলের কিওয়ার্ড।

যেমন: এই আর্টিকেলে আমি আলোচনা করতেছি ‘ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায়’ নিয়ে। সুতরাং আমার এই আর্টিকেলের মূল কিওয়ার্ড হচ্ছে ’ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায়’।

আপনি যে বিষয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন সে বিষয়ে মানুষ কি কি জানতে চায় তা রিসার্চ করে বের করে সে সব আর্টিকেল লিখবেন। তবেই মানুষ আপনার ওয়েবসাইটের আর্টিকেল গুলো পড়বে।

আর্টিকেল রিসার্চ করার জন্য বিভিন্ন ফ্রি এবং পেইড টুলস রয়েছে। যেমন: Keyword planner, Semrush, Ahrefs, Ubersuggest ইত্যাদি।

 

৪: এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল লিখতে হবে (SEO Friendly Article)

 

মনে করেন আপনার ঘরের সব আসবাবপত্র আপনি কিনেছেন। যেমন: টিভি, ফ্রিজ, আলমারি, শোকেস, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন এসব কিছু ঘরে সাঝিয়ে না রেখে এলোমেলো করে রেখেছেন। আপনিই বলেন যদিও ঘরে সব আসবাবপত্র আছে কিন্তু এমন অগোছালো ঘর কি কেও পছন্দ করবে? অবশ্যই করবে না।

ঠিক একই ভাবে আর্টিকেলে যতই তথ্যে ভরপুর থাকুক না কেন তা যদি সঠিকভাবে সাঝানো না থাকে তা গুগল পছন্দ করে না। ফলে আর্টিকেল গুগলে রেংক ও করে না।

এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল হচ্ছে সেইসব আর্টিকেল যেগুলোতে হেডিং, সাব-হেডিং সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যে টপিক নিয়ে আর্টিকেলে লিখেছে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, আর্টিকেলে যেখানে প্রয়োজন সেখানে ছবি যোগ দেওয়া, আর্টিকেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল লিংকিং করা ইত্যাদি। এইসব মেনে আর্টিকেল লিখলে সেগুলো এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

বর্তমানে গুগলে রেংক পেতে এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল এর বিকল্প নেই।

 

৫: গুগল সার্চ কনসোলে ওয়েবসাইট এড করা (Google search console)

 

গুগল আপনা আপনি আপনার ওয়েবসাইটের আর্টিকেলকে গুগলে শো করাবে না। গুগলে আপনার ওয়েবসাইটের আর্টিকেল শো বা দেখানোর জন্য অবশ্যই আপনার ওয়েবসাইটটিকে গুগল সার্চ কনসোলে এড করতে হবে।

অনেকেই নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করে সাথে সাথেই ওয়েবসাইটকে গুগল সার্চ কনসোলে এড করে ফেলে। যা না করে আপনি প্রথমে ১৫-২০ টি আর্টিকেল আগে আপনার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে তারপর আপনার ওয়েবসাইটিকে গুগল সার্চ কনসোলে এড করবেন।

গুগল সার্চ কনসোলে ওয়েবসাইট এড করার পর থেকে আপনার ওয়েবসাইটের আর্টিকেল গুলো গুগলে শো করা শুরু করবে এবং সেই সাথে আপনার ওয়েবসাইটে অর্গানিক ট্রাফিক ও যাওয়া শুরু করবে।

 

৬: ওয়েবসাইটের নামে স্যোসাল মিডিয়া একাউন্ট (Social media account) তৈরি করা

 

আপনি যে ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন সেটির নামে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম সহ বিভিন্ন স্যোসাল মিডিয়াত গিয়ে পেজ বা একাউন্ট তৈরি করবেন।

এতে করে সেসব প্লাটফর্মে আপনার কমিউনিটি তৈরি হবে এবং আপনার যখনই আপনার ওয়েবসাইটে কোন আর্টিকেল প্রকাশ করবেন বা আপনার ওয়েবসাইটে কোন আপডেট করলেও আপনার ওয়েবসাইটের ভিজিটররা সেসব বিষয়ে জানতে পারবে। যা আপনার ওয়েবসাইটের জন্য অনেক বড় একটা পজেটিভ প্রভাব ফেলবে।

 

৭: ওয়েবসাইটে নিয়মিত আর্টিকেল প্রকাশ করা

 

ওয়েবসাইটে একদিনে অনেকগুলো আর্টিকেল প্রকাশ করে পরে আবার অনেকদিন আর্টিকেল প্রকাশ না করলে সেগুলোকে অনিয়মিত আর্টিকেল প্রকাশ করা বলে, যা আপনার একদমই করা উচিত নয়।

আপনি একদিনে অনেকগুলো আর্টিকেল প্রকাশ না করে চেষ্টা করবেন নিয়মিত দুই একটা করে আর্টিকেল প্রকাশ করার। এতে করে আপনার ওয়েবসাইটে যখন কোন রিটার্ণ ভিজিটর আসবে তখন সে নতুন কন্টেন্ট দেখতে পারবে আপনার ওয়েবসাইটে।

তাছাড়া নিয়মিত আর্টিকেল প্রকাশ করা ওয়েবসাইট গুলোতে গুগলেরও পজিটিভ প্রভাব পরে।

 

৮: ওয়েবসাইট স্পীড (Website Speed) এর দিকে খেয়াল রাখা

 

আমরা ওয়েবসাইটের ডিজাইনকে সুন্দর করে তোলার চক্করে পরে অনেক ধরনের প্লাগিন (Plugins), CSS Code এড করে থাকি ওয়েবসাইটে। যার ফলে আমাদের ওয়েবসাইটের স্পীড অনেক স্লো হয়ে যায়। ফলে ইউজার বা ভিজিটর যখন আমাদের ওয়েবসাইটে এসে কোন আর্টিকেল ওপেন করতে যায়, তখন সেটি ওপেন হতে অনেক সময় নেয়।

আর এই অনেকক্ষণ সময় নেওয়ার কারণে ভিজিটর বিরক্ত হয়ে আমাদের ওয়েবসাইট থেকে বের হয়ে অন্য ওয়েবসাইটে চলে যায়।

তাই চেষ্টা করবেন ওয়েবসাইটের ডিজাইন সিম্পল রাখতে এবং ওয়েবসাইটের স্পীড অনেক ফাস্ট রাখতে।

 

৯: ওয়েবসাইটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেজ তৈরি করা

 

প্রত্যেকটি ওয়েবসাইটেরই গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেজ থাকে। যেমন: About us, Contact us, Privacy policy, Disclaimer ইত্যাদি।

আপনার ওয়েবসাইটেই এইসব পেজ তৈরি করে রাখবেন।

তাছাড়া এই সব পেজ আপনার ওয়েবসাইটে না থাকলে আপনি গুগল এডসেন্স (Google Adsense) এর মনিটাইজেশন (Monitizaiton) ও পাবেন না।

 

১০: ওয়েবসাইট মনিটাইজেশন করা (Website Monitization)

 

একজন ব্লগারের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে ওয়েবসাইট তৈরি করে সেই ওয়েবসাইট থেকে উপার্জন করা।

একটি ওয়েবসাইট থেকে বিভিন্ন ভাবে অর্থ উপার্জন করা যায়। যেমন: বিজ্ঞাপন এর মাধ্যমে, স্পন্সরড এর মাধ্যমে, এফিলিয়েট মার্কেটিং এর মাধ্যমে ইত্যাদি।

তবে বেশিরভাগ ব্লগার তাদের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপণ দেখানোর মাধ্যমেই উপার্জন করে থাকে।

আপনার ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য আপনার ওয়েবসাইটটিকে বিভিন্ন এড নেটওয়ার্ক (Ad Network) এ এপ্রুভাল নিতে হবে।

জনপ্রিয় কয়েকটি এড নেটওয়ার্কের নাম নিচে দেওয়া হলো:

  • Google Adsense
  • Ezoic
  • Media.net

আপনি উপরের যে কোন একটি এড নেটওয়ার্কে আপনার ওয়েবসাইটটি মনিটাইজ করতে পারলেই আপনার ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করতে পারবেন।

আর বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করলেই আপনার ওয়েবসাইট থেকে ইনকাম শুরু হয়ে যাবে। তখন আপনার ওয়েবসাইটে ভিজিটর যত বেশি আনতে পারবেন আপনার ইনকাম ও তত বেশি হবে এবং আপনি একজন সফল ব্লগার এর কাতারে নাম লেখাবেন।

 

পরিশেষে, এই আর্টিকেলে আমি ’ব্লগিং এ সফল হওয়ার ১০টি কার্যকরী উপায়’ সেয়ার করলাম আপনাদের সাথে। আশাকরি এই আর্টিকেলে দেখানো নিয়মগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করে কাজ করতে পারলে আপনি ব্লগিং এ সফল হতে পারবেন।

এ বিষয়ে আপনার যদি আরও কিছু জানার থাকে তাহলে তা আমাকে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। আমি যত দ্রুত সম্ভব আপনার কমেন্টের রিপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করব।

Spread the love

হ্যালো "ট্রিকবিডিব্লগ" বাসী আমি ওসমান আলী। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। Trick BD Blog আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

Leave a Comment